বুরকিনা ফাসোর সামরিক শাসক ইব্রাহিম ত্রাওরে আফ্রিকার তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু জনপ্রিয়তা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় এখন তাঁকে পড়তে হচ্ছে নিরাপত্তা সংকট, সেনাবাহিনীর ভেতরের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকোচনের কারণে।
ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে ২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর দ্রুতই বুরকিনা ফাসোর অন্যতম আলোচিত নেতা হয়ে ওঠেন। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের প্রভাব প্রত্যাখ্যান, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, স্বনির্ভর অর্থনীতি এবং জঙ্গিবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে প্রয়াত বিপ্লবী নেতা থমাস সানকারার উত্তরাধিকার ও আফ্রিকার আত্মনির্ভরতার কথা।
কিন্তু এখন সেই জনপ্রিয়তার সামনে কঠিন বাস্তবতা হাজির হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ত্রাওরে ক্ষমতায় এসেছিলেন। অথচ জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হামলা এখনো অব্যাহত। ফলে তাঁর সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা।
বুরকিনা ফাসো কয়েক বছর ধরে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাহেল অঞ্চলের বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বিশ্বে সন্ত্রাসবাদজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। দুর্বল প্রশাসন, দারিদ্র্য, জলবায়ু সংকট এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা জঙ্গিদের বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে।
ত্রাওরে ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ‘ভলান্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ বা ভিডিপি বাহিনীকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছেন। সরকারের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে জঙ্গিদের মোকাবিলা করা।
তবে সামরিক অভিযান বাড়লেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে বুরকিনা ফাসোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথাও উঠে এসেছে।
এখানেই ত্রাওরের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ তিনি আগের সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এখন তাঁর নিজের সরকারের আমলেও যদি সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় থাকে, তাহলে তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে।
ত্রাওরের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য।
বুরকিনা ফাসোর সাম্প্রতিক ইতিহাসে অভ্যুত্থান নতুন কিছু নয়। ত্রাওরে নিজেও ২০২২ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধেও অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেও সরকার একটি কথিত অভ্যুত্থান ও হত্যাচেষ্টা নস্যাৎ করার দাবি করে। একই সময়ে রাজধানী ওয়াগাদুগুতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনাও সামরিক সরকারের অভ্যন্তরীণ সংহতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
এখানে প্রতিবেশী নাইজারের সাম্প্রতিক ঘটনাও ত্রাওরের জন্য সতর্কবার্তা। আগস্টের শেষ দিকে নাইজারের রাজধানী নিয়ামেতে বিদ্রোহী সেনারা বিমানবন্দর ও প্রেসিডেন্টের স্থাপনায় হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত রুশ বাহিনীর সহায়তায় নাইজারের সামরিক সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাটি দেখিয়েছে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ সেনাবাহিনীর ভেতরেও ক্লান্তি ও অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
ত্রাওরের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর সরকার দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেয়। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ আরও সংকুচিত হয়েছে।
এ ছাড়া গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সরকারের সমালোচকদের ওপর চাপ বাড়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ত্রাওরে গণতন্ত্র নিয়ে কঠোর মন্তব্যও করেন। ফলে তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার পদক্ষেপ হলেও সমালোচকদের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষণ।
এই দ্বন্দ্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ত্রাওরের জনপ্রিয়তার একটি বড় অংশ এসেছে ‘পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প’ হিসেবে তাঁর আবির্ভাব থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে থাকলে সেই জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে ব্যক্তিনির্ভর শাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
ত্রাওরে ফ্রান্সের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছেন। একই পথ অনুসরণ করেছে মালি ও নাইজার। তিন দেশ মিলে গঠন করেছে অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস (এএসইএস)।
এই জোট ত্রাওরেকে আঞ্চলিকভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নিজেরাই পরিচালনা করতে পারে।
কিন্তু রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতারও ঝুঁকি রয়েছে। নাইজারের সাম্প্রতিক সংকটে রুশ আফ্রিকা কর্পসের সরাসরি ভূমিকা দেখিয়েছে, সামরিক সরকারের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
ত্রাওরের সামনে তাই মূল প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘তিনি জনপ্রিয় কি না’ বরং তিনি সেই জনপ্রিয়তাকে বাস্তব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে পারবেন কি না।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর সরকার কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলা এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাহেল অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সংকুচিত হওয়া এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নত না হলে জনসমর্থনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ত্রাওরের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর জনপ্রিয়তা এবং জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি, আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে এই জনপ্রিয়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তিনি যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে পারেন, তাহলে তাঁর নেতৃত্ব সাহেল অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু জঙ্গি হামলা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও রাজনৈতিক সংকোচন একসঙ্গে বাড়তে থাকলে আজকের জনপ্রিয় নেতা আগামী দিনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন।