শফিকুল আলম সেলিম
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব পোলিও দিবস। মানবসভ্যতার জন্য একসময় ভয়াবহ আতঙ্কের নাম ছিল পোলিও। এই রোগ কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য শিশুর স্বাভাবিক জীবন, পঙ্গুত্বের শিকার করেছে বহু মানুষকে, ভেঙে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। অথচ বিজ্ঞান, চিকিৎসা গবেষণা, টিকাদান কর্মসূচি এবং মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পোলিওকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানানোর স্বপ্ন আজ বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি। বিশ্ব পোলিও দিবস তাই কেবল একটি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক দিবস নয়; এটি মানবিক দায়িত্ববোধ, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকারের প্রতীক।
পোলিওমাইলাইটিস, সংক্ষেপে পোলিও, একটি সংক্রামক রোগ। পোলিওভাইরাসের সংক্রমণে এই রোগ হয়। মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এর ঝুঁকিতে বেশি থাকে। তবে যেকোনো বয়সের মানুষ টিকা না নিয়ে থাকলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। ভাইরাসটি সাধারণত দূষিত পানি ও খাবার কিংবা সংক্রমিত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে ছড়ায়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ঘাটতি সংক্রমণের বিস্তার বাড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। কারও কারও জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি কিংবা হাত-পায়ে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু অল্পসংখ্যক আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভাইরাস স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে পেশির পক্ষাঘাত ঘটাতে পারে। এই পক্ষাঘাত অনেক সময় স্থায়ী হয়ে যায়। শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি আক্রান্ত হলে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
পোলিওর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এর কারণে সৃষ্ট পক্ষাঘাতের কোনো নির্দিষ্ট নিরাময় নেই। আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে জরুরি চিকিৎসা, শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন ও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একবার স্থায়ী পক্ষাঘাত দেখা দিলে স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে পোলিও প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকা শিশুকে আজীবন পঙ্গুত্বের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব পোলিও দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাবিজ্ঞানী জোনাস সাল্কের উদ্ভাবিত নিষ্ক্রিয় পোলিও টিকা ব্যবহারের অনুমোদন পায়। পরে ১৯৬০-এর দশকে আলবার্ট সাবিনের উদ্ভাবিত মুখে খাওয়ানোর পোলিও টিকা বিশ্বজুড়ে টিকাদান কার্যক্রমকে আরও সহজ ও বিস্তৃত করে। এই দুই ধরনের টিকাই পোলিও প্রতিরোধে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছে। টিকাদানের ব্যাপক প্রসারের ফলে বহু দেশে পোলিওর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সহযোগিতায় বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল উদ্যোগ আরও সুসংগঠিত রূপ পায়। ওই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ বৈশ্বিক পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য গ্রহণ করে। তখন বিশ্বের ১২৫টির বেশি দেশে পোলিওর সংক্রমণ ছিল এবং প্রতিবছর কয়েক লাখ শিশু পক্ষাঘাতের শিকার হতো বলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ব্যাপক টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমণের উৎস অনুসন্ধান এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বজুড়ে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ১৯৮৮ সালের তুলনায় ৯৯ শতাংশের বেশি কমেছে। এটি জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম বড় সাফল্য।
তবে পোলিও নির্মূলের ইতিহাসে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে সতর্কতার বার্তাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০২ সালে ইউরোপীয় অঞ্চলকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করে। সেই অর্জন ধরে রাখতে নিয়মিত টিকাদান, উন্নত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে। কোনো অঞ্চল পোলিওমুক্ত ঘোষিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেখানে ভবিষ্যতে সংক্রমণের আশঙ্কা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, জনসংখ্যার চলাচল কিংবা টিকাদানের ঘাটতির কারণে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই পোলিও নির্মূলের লড়াইয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে পোলিও নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগ শুরুর পর থেকে বিশ্বে বন্য পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ ৯৯ শতাংশের বেশি কমেছে। কিন্তু এখনো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বন্য পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কোনো দেশে টিকাদানের হার কমে গেলে কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর শিশুরা টিকার আওতার বাইরে থাকলে সেখানে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে পোলিও নির্মূলের শেষ ধাপটি অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি অর্জিত সাফল্য ধরে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য পোলিও প্রতিরোধের এই লড়াই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল ২০১৪ সালে পোলিওমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ অর্জনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের টিকাদান কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস পরিশ্রম, সরকারের উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশেও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের পোলিও টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবে পোলিওমুক্ত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই ভবিষ্যতে সংক্রমণের আশঙ্কা নেই, এমন নয়। তাই প্রতিটি শিশুর টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগের লক্ষণ শনাক্ত ও সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস অনুসন্ধানে সতর্ক থাকতে হবে।
পোলিও নির্মূলের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অসচেতনতা, ভুল ধারণা, গুজব কিংবা টিকাদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ একটি শিশুকে পোলিওর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ডোজ টিকা দেওয়া জরুরি। কোনো শিশু একটি ডোজ গ্রহণ করলেই তার সুরক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ করতে হবে এবং কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিতে হবে। টিকা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক কিংবা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বও কম নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম জনপদ, দরিদ্র পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছে দিতে হবে। শুধু শহর কিংবা সহজে পৌঁছানো যায় এমন এলাকার শিশুদের টিকা নিশ্চিত করলেই পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল, টিকা সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং কার্যকর তদারকি। পাশাপাশি কোনো শিশুর হঠাৎ হাত-পা দুর্বল হয়ে পড়া বা পক্ষাঘাতের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষেরও এ ধরনের ঘটনা যথাযথভাবে অনুসন্ধান ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
পোলিও নির্মূলের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সংক্রামক ভাইরাস কোনো দেশের সীমানা মানে না। একটি অঞ্চলে ভাইরাসের উপস্থিতি থাকলে অন্য অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই টিকাদান কর্মসূচি, রোগ শনাক্তকরণ, পরীক্ষাগারভিত্তিক অনুসন্ধান এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, বিভিন্ন দেশের সরকার, চিকিৎসক, গবেষক, স্বেচ্ছাসেবক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অপরিহার্য।
বিশ্ব পোলিও দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা শুধু তার পরিবারের স্বপ্ন নয়; এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও অংশ। যে শিশু আজ নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে, আগামী দিনে সে-ই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখবে। পোলিওর কারণে কোনো শিশুর চলার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতি নয়, বরং তার সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। তাই প্রতিরোধযোগ্য এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনো শিশুকে অবহেলার শিকার হতে দেওয়া যায় না।
বিশ্ব পোলিও দিবসের অঙ্গীকার হোক প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা, প্রতিটি পরিবারের জন্য সচেতনতা এবং প্রতিটি দেশের জন্য কার্যকর জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পোলিওমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত টিকাদান ও নজরদারি কার্যক্রমে কোনো শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ একটি শিশুও যদি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিজ্ঞান আমাদের প্রতিরোধের উপায় দিয়েছে, আর সম্মিলিত উদ্যোগ সেই উপায়কে সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে। বিশ্ব পোলিও দিবসে তাই নতুন করে শপথ নিতে হবে সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো শিশুর হাসি পোলিওর কারণে থেমে যাবে না, কোনো পরিবারকে সন্তানের পঙ্গুত্বের বেদনা বহন করতে হবে না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে রোগটির ভয়াবহতা থেকে মুক্ত নিরাপদ পৃথিবীতে।