বিশ্ব তুলা দিবস: প্রাকৃতিক আঁশের সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের তুলা অর্থনীতি

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

তুলা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ। মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিল্প ও নানা ধরনের ব্যবহারিক পণ্যে তুলার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। তুলা শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; বিশ্ব অর্থনীতি, বস্ত্রশিল্প, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তুলার এই গুরুত্বকে সামনে রেখে প্রতি বছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব তুলা দিবস পালিত হয়। ২০২০ সালে ‘তুলা একটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হয়।
বিশ্ব তুলা দিবসের যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। আফ্রিকার চারটি প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশ বেনিন, বুরকিনা ফাসো, চাদ ও মালির উদ্যোগে জাতিসংঘের কাছে ৭ অক্টোবরকে বিশ্ব তুলা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে।
তুলা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে তুলার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুলা চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষকের পাশাপাশি বীজ উৎপাদন, তুলা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সুতা তৈরি, বয়ন, পোশাক উৎপাদন ও বিপণন প্রতিটি ধাপেই সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিশ্বের প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব দেশে তুলা কৃষি ও শিল্প দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা ও কাপড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের বিপুল চাহিদার কারণে তুলার গুরুত্বও ক্রমাগত বাড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও দেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পে প্রয়োজনীয় তুলার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে তুলার আমদানিনির্ভরতা কমানো দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দেশীয়ভাবে তুলা উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে কৃষকের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে তুলা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি, জলবায়ু ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাত নির্বাচন, উন্নত বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও তুলনামূলকভাবে কম উর্বর জমিতে তুলা চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কৃষকের জন্য একটি বিকল্প অর্থকরী ফসলের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২০২০ সালের বিশ্ব তুলা দিবসটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সে সময় বিশ্ব করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ প্রভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। করোনার কারণে স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক আয়োজন ও বড় পরিসরের অনুষ্ঠান সীমিত হয়ে পড়ে। তবে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন দেশ অনলাইন সভা, ওয়েবিনার, আলোচনা, কর্মশালা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সীমিত পরিসরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।
বাংলাদেশেও ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বিশ্ব তুলা দিবস পালনের কর্মসূচি নেওয়া হয়। ওয়েবিনার ও কর্মশালার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন তুলা উৎপাদন এলাকায় সীমিত পরিসরে মানববন্ধন, পোস্টার ও ফেস্টুন প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল তুলার গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষক, ভোক্তা, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দেশীয় তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরা।
তবে বাংলাদেশের তুলা খাতের সামনে বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ, উন্নতমানের বীজের প্রাপ্যতা, রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ, বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এসব বিষয় তুলা চাষের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে তুলা উৎপাদনের সঙ্গে তুলা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
তুলা চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, কৃষকের লাভজনকতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। কৃষক যদি উৎপাদিত তুলার ন্যায্য দাম না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তুলা চাষে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, ফসলের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা এবং নিশ্চিত বাজার এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্ব তুলা দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশ। তুলা প্রাকৃতিক আঁশ হওয়ায় এটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাঁচামাল। তবে তুলা উৎপাদনে পানি ব্যবহার, কীটনাশকের ব্যবহার এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়। তাই ভবিষ্যতের তুলা চাষ হতে হবে আরও টেকসই, পানি-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কৃষি উপকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
করোনাকালে বিশ্ব তুলা দিবসের আয়োজন সীমিত হলেও তুলার গুরুত্ব কোনোভাবেই কমেনি। বরং মহামারি বিশ্ব অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। এর ফলে কৃষি ও শিল্পের স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি কেবল কৃষির উন্নয়ন নয়; এটি বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এই শিল্পের পেছনে রয়েছে বিশাল স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পের অবকাঠামো। সেই শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি বড় অংশ যদি দেশের কৃষকের উৎপাদিত তুলা থেকে সরবরাহ করা যায়, তাহলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হবে। ফলে তুলা উৎপাদনকে শুধু একটি কৃষিপণ্য হিসেবে না দেখে কৃষি-শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ব তুলা দিবস তাই কেবল একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি কৃষক ও কৃষির প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক আঁশের গুরুত্ব, টেকসই কৃষি, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর ও তৈরি পোশাক রপ্তানিনির্ভর দেশে তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামালের জোগানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বস্ত্র ও স্পিনিং শিল্প এবং কৃষকদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী জাত উদ্ভাবন, উন্নত বীজের সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকের উৎপাদিত তুলার ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে তুলা চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বিশ্ব তুলা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির দেওয়া এই প্রাকৃতিক আঁশ শুধু মানুষের পরিধেয় বস্ত্রের উপাদান নয়, এটি কোটি মানুষের জীবিকা, কৃষকের স্বপ্ন এবং শিল্পের অর্থনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই তুলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, বিনিয়োগ ও কৃষকবান্ধব নীতি। দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলা হয়ে উঠতে পারে আরও শক্তিশালী এক সম্ভাবনার নাম।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ