তবে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে ধীরগতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

প্রবৃদ্ধি বাড়ছে অর্থনীতিতে, ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত 

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা, বিনিয়োগে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ার তথ্য অর্থনীতিতে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ ঘুরে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। বরং এটিকে পুনরুদ্ধারের একটি সম্ভাবনাময় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেড়েছে। একই সময়ে চলতি বাজারমূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকারও বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তথ্যও অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রবৃদ্ধি বাড়ার পেছনে সেবা খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন, যোগাযোগ, বাণিজ্য, আর্থিক সেবা, আবাসনসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে ভূমিকা রেখেছে। শিল্প ও কৃষির পরিস্থিতিও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির একটি খাত যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অন্য খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের জন্য সব খাতেই ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ মোট দেশজ উৎপাদন বাড়লেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমে যায় না। বরং গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কমেনি। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মূল্যস্ফীতি নিয়ে। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু একই সময়ে যদি খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে কমেও যেতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটি নির্ধারণে শুধু প্রবৃদ্ধির হার যথেষ্ট নয়। মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি, কর্মসংস্থান ও পরিবারের ব্যয়ের চাপও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা ব্যাংক খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার প্রশ্ন তৈরি করেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। ব্যাংক থেকে উদ্যোক্তারা সহজে অর্থ না পেলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ব্যাংকের আমানতকারীরা আস্থাহীনতায় ভুগলে আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও তার প্রভাব পড়ে। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার এখন শুধু আর্থিক খাতের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি শক্তিশালী করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অর্থনীতিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন নতুন কারখানা স্থাপন করেন, ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন বা নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেন, তখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। উৎপাদন বাড়ে, বাজারে চাহিদা তৈরি হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ে। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ঋণ, কার্যকর অবকাঠামো, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই জমি, গ্যাস-বিদ্যুৎ, করব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতির অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা যদি উৎপাদন ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নীতির বিষয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেন। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বিনিয়োগ না বাড়লে সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হয় না।অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ করা গেলে অর্থনীতির বৈদেশিক খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে। কৃষিও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে। আবার কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকের আয় কমে যায়। তাই কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবৃদ্ধির এই উন্নতি কতটা টেকসই হবে। এর উত্তর নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে অর্থনৈতিক সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে বা সাময়িকভাবে কিছু সূচকের উন্নতি ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন কেবল কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হবে। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়, যখন তার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনমানেরও উন্নতি ঘটে।

বাংলাদেশের সামনে এখন তাই দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিকে সম্ভাবনার দরজা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে যেতে হলে সংস্কার ও বাস্তবভিত্তিক নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রকৃত সাফল্য তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আসবে। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে না; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ