ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনার অধিকার সম্প্রসারণ, মুসলিম জনগোষ্ঠী নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য এবং অভিবাসন কঠোর করার প্রস্তাব ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় রিস্টোর ব্রিটেনের নেতা রুপার্ট লো। তবে তাঁর বক্তব্য, সংসদে উত্থাপিত আইন এবং যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান আইনি অবস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতা, অভিবাসন এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সংসদ সদস্য রুপার্ট লো। তাঁর নেতৃত্বাধীন রিস্টোর ব্রিটেন অভিবাসন কমানোর পরিবর্তে তা উল্টে দেওয়ার, আশ্রয়ব্যবস্থা পুনর্গঠনের এবং ব্রিটিশ সমাজে ইসলামের প্রভাব কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠী ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করতে হলে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, দলের আনুষ্ঠানিক নীতিপ্রস্তাব এবং ব্রিটেনের আইন ও সরকারি পরিসংখ্যানকে আলাদা করে দেখতে হবে। বিশেষ করে ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত আইন নিয়ে সংসদে উত্থাপিত একটি বিলের সঙ্গে লোর নাম জড়িয়ে পড়লেও বিলটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন আরেক সংসদ সদস্য, নিক টিমোথি। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নথিতেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
ধর্ম অবমাননা নয়, ধর্মের সমালোচনার অধিকার নিয়ে বিল
২০২৫ সালের ১০ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন (রিলিজিয়ন অর বিলিফ সিস্টেম)’ শীর্ষক একটি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিলটির উদ্যোক্তা ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য নিক টিমোথি। বক্তব্যে তিনি বলেন, মুহাম্মদকে তিনি নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন না এবং যিশুখ্রিষ্টসহ কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ব্যঙ্গ, সমালোচনা বা বিদ্রূপ করার কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। রুপার্ট লোও বিলটি উত্থাপনের জন্য নাম দেওয়া সংসদ সদস্যদের তালিকায় ছিলেন।
বিলটির উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত করা। প্রস্তাবে পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট ১৯৮৬-এর ধর্মীয় বিদ্বেষসংক্রান্ত বিধানে থাকা মতপ্রকাশের সুরক্ষা অন্য কিছু ধারায়ও সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগসংক্রান্ত দুটি আইনের প্রয়োগে একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০০৮ সালেই প্রচলিত আইনের অধীনে ধর্ম অবমাননা ও ধর্মীয় অবমাননামূলক প্রকাশনার অপরাধ বিলুপ্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে, পাবলিক অর্ডার অ্যাক্টের ২৯জে ধারায় ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা, বিদ্রূপ, অপছন্দ বা অপমানসূচক বক্তব্যের সুরক্ষা রয়েছে নির্দিষ্ট আইনি পরিসরে। ফলে ২০২৫ সালের বিলটি পুরোনো ধর্ম অবমাননা আইন বাতিলের বিল ছিল না; বরং বিদ্যমান আইন কীভাবে প্রয়োগ করা যাবে, সে বিষয়ে মতপ্রকাশের সুরক্ষা সম্প্রসারণের প্রস্তাব ছিল। সরকারও ২০২৫ সালের মে মাসে সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে জানায়, ইংল্যান্ডে ধর্ম অবমাননার কোনো আইন নেই এবং সরকার এমন আইন পুনঃপ্রবর্তন করবে না।
‘ব্রিটেনের ইসলামীকরণ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি
রুপার্ট লোর রাজনৈতিক বক্তব্যের আরেকটি প্রধান বিষয় হলো ব্রিটিশ সমাজে ইসলামের প্রভাব ও মুসলিম অভিবাসন। ২০২৬ সালের আগস্টে ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, লো নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকের সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতার শর্ত হিসেবে অভিবাসন উল্টে দেওয়া এবং ব্রিটেনের ‘ইসলামীকরণ’ বন্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বোরকা, হালাল ও কোশার পদ্ধতিতে পশু জবাই, চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে এবং শরিয়াহ আদালত নিষিদ্ধ করার মতো প্রস্তাবও সামনে আনেন।
এসব বক্তব্য লোর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। তবে ব্রিটেনে বসবাসরত সব মুসলমানের ধর্মীয় চর্চা ব্রিটিশ জীবনধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—এমন বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায় না। একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বাস, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মত এবং জীবনযাপনের ধরনে পার্থক্য রয়েছে।
ব্রিটেনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ভিত্তিতে পুরো দেশ ‘ইসলামীকরণ’-এর পথে রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও পরিসংখ্যানগতভাবে যথেষ্ট নয়। এ ধরনের বক্তব্যকে তাই লোর রাজনৈতিক দাবি হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যাচাইকৃত জাতীয় বাস্তবতা হিসেবে নয়।
অভিবাসন বন্ধ নয়, উল্টো প্রবাহ তৈরির নীতি
রিস্টোর ব্রিটেনের অভিবাসননীতিতে কেবল নতুন অভিবাসন কমানো নয়, বরং অতীতের অভিবাসন প্রবাহ উল্টে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দলের প্রকাশিত নীতিতে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার, আশ্রয়ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে নতুন ব্যবস্থা চালু, বিদেশি নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা সীমিত করা এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জন কঠিন করার প্রস্তাব রয়েছে।
দলটির নীতিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ইংরেজি বলতে না পারা, সামাজিক আবাসনে থাকা, সরকারি ভাতা গ্রহণ, কাজ করতে অস্বীকৃতি, অপরাধে জড়ানো কিংবা দলের ভাষায় ব্রিটিশ জীবনধারার সঙ্গে একীভূত হতে ব্যর্থ হওয়া নির্দিষ্ট বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কারের কারণ হতে পারে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বৈধভাবে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও অধিকারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে নীতিপত্রে কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য কঠোর ভিসাব্যবস্থা বা ‘রেড লিস্ট’ তৈরির প্রস্তাব থাকা আর পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সোমালিয়া, আফগানিস্তান ও ইরানের সব নাগরিকের ওপর সম্পূর্ণ অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা ঘোষিত হওয়া এক বিষয় নয়। পাওয়া নীতিসূত্রগুলোতে ওই পাঁচ দেশের প্রত্যেকটির জন্য সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে এই দাবিকে নিশ্চিত নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।
একইভাবে, রিস্টোর ব্রিটেনের এসব প্রস্তাবকে কার্যকর আইন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো দলটির রাজনৈতিক অঙ্গীকার; বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, সংসদীয় অনুমোদন এবং প্রযোজ্য আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করতে হবে।
শিশু যৌন শোষণ ও ‘গ্রুমিং গ্যাং’ নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাজ্যে শিশুদের যৌন শোষণে জড়িত চক্রের তদন্ত ও বিচার দীর্ঘদিনের একটি গুরুতর জনস্বার্থের বিষয়। রুপার্ট লো এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিম পুরুষদের ভূমিকা নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি অপরাধীদের শুধু ‘এশীয় গ্রুমিং গ্যাং’ না বলে ‘পাকিস্তানি মুসলিম ধর্ষক চক্র’ হিসেবে অভিহিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সরকারি তদন্তের ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ব্যারোনেস লুইস কেসি ২০২৫ সালের ১৬ জুন প্রকাশিত জাতীয় নিরীক্ষায় শিশুদের দলবদ্ধ যৌন শোষণের পরিসর, অপরাধীদের বৈশিষ্ট্য এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা পরীক্ষা করেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে অপরাধীদের জাতিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অপরাধীর ক্ষেত্রে জাতিগত পরিচয় নথিভুক্ত ছিল না। ফলে দেশজুড়ে এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে গ্রেটার ম্যানচেস্টার, সাউথ ইয়র্কশায়ার ও ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের মতো কয়েকটি এলাকায় এশীয় বংশোদ্ভূত পুরুষদের অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই ফলাফল দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রথমত, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বা এশীয় পরিচয়ের কিছু অপরাধীর বিরুদ্ধে শিশু যৌন শোষণের অভিযোগ, তদন্ত ও দণ্ডের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট অপরাধীদের পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রমাণ নেই।
কেসির নিরীক্ষায় অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি। ফলে নির্দিষ্ট অপরাধচক্রের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত ওই নিরীক্ষা থেকে টানা যায় না। একই সঙ্গে, অপরাধীদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অভিবাসন, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন
ম্যানচেস্টারের ‘কারি মাইল’-এর মতো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক এলাকাগুলো নিয়েও লো সমালোচনা করেছেন। এসব এলাকাকে ঘিরে তাঁর বক্তব্য বৃহত্তর অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক একীভবন বিতর্কের অংশ। তবে কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট ভাষা, খাবার, পোশাক বা ধর্মীয় রীতির উপস্থিতি নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে সেখানকার বাসিন্দারা ব্রিটিশ আইন অমান্য করছেন কিংবা আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।