ফলের চড়া দামে বিপাকে সাধারণ মানুষ, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়াও এখন ব্যয়বহুল

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু আমদানি করা ফল নয়, দেশীয় ফলের বাজারেও স্বস্তি নেই। মানভেদে পাকা পেঁপে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১২০ টাকায়। কলার প্রতি ডজনের দাম ৮০ থেকে ১৫০ টাকা। পেয়ারার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, জাম্বুরা প্রতিটি ৫০ থেকে ১০০ টাকা, সবুজ মাল্টার কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং আমড়ার কেজি ৫০ থেকে ৭০ টাকা। এসব ফলের মধ্যে কিছু তুলনামূলক সস্তা হলেও সব পরিবারের পক্ষে নিয়মিত কেনা সহজ নয়। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হলে ফলের পেছনে মাসিক ব্যয়ও বাড়ে।

ফলের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কজন ক্রেতা। তারা বলেন, চারদিকে জ্বর ও ডেঙ্গুর প্রকোপ রয়েছে। চিকিৎসকেরা ভিটামিন সি পাওয়া যায় এমন ফল খেতে বলেন। কমলা ও মাল্টায় ভিটামিন সি রয়েছে। কিন্তু এসব ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফল খেতে চাইলেও অনেকের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

তাদের বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাজারদর বেশি হলে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে তার প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু ও বয়স্কদের জন্য ফল কেনার প্রয়োজন দেখা দিলে পরিবারের ব্যয় আরও বাড়ে। ডেঙ্গু কিংবা অন্য অসুস্থতার সময় রোগীর জন্য ফল কিনতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে। তবে কোনো ফল খেলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা নিরাময় হয় না; চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফলের চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানিসংশ্লিষ্ট শুল্ক-কর এবং পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের কারণে বাজারে দাম বাড়ছে। আমদানি করা ফলের ক্ষেত্রে শুল্কের পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজারদর, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য সরবরাহ ব্যয়ও চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া আমদানি করা ফলের ক্যারেটে নষ্ট বা পচা ফল থাকলে বিক্রির উপযোগী ফলের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ পড়ে। এসব ব্যয় পুষিয়ে নিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা বিক্রয়মূল্য বাড়ান বলে তাঁদের দাবি।

ফল বিক্রেতারা বলছেন, ফলের চাহিদা বাড়ছে, একই সঙ্গে দামও বাড়ছে। তাঁদের ভ্যাট দিতে হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এক কেজি ফলে ১২০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। ক্রেতাদের ধারণা, দাম বাড়লে বিক্রেতাদের লাভও অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু তাঁর দাবি, ১০ বছর আগে ফল বিক্রি করে প্রতি কেজিতে যে পরিমাণ লাভ হতো, এখনো প্রায় একই রকম লাভ হয়; মূলত পণ্যের দাম বেড়েছে।

 

আরেকজন বিক্রেতা বলেন, ডেঙ্গুর কারণে মাল্টাসহ কয়েক ধরনের ফলের চাহিদা বেড়েছে। তাঁরা পুরান ঢাকার বাদামতলী থেকে ফল সংগ্রহ করেন। অনেক সময় একটি ক্যারেটে বেশ কিছু নষ্ট ফল পাওয়া যায়। এতে বিক্রিযোগ্য ফলের ওপর ক্ষতির চাপ পড়ে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কিছুটা বেশি দামে ফল বিক্রি করতে হয় বলে জানান তিনি।

তবে ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আমদানি, পাইকারি বাজার, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং খুচরা বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকৃত ব্যয় ও মুনাফার হিসাব জানা জরুরি। শুধু চাহিদা বৃদ্ধি কিংবা নষ্ট ফলের অজুহাতে দাম বাড়ছে কি না, তা বুঝতে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং বাজার তদারকির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাজারে সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপ থাকলেও তার প্রভাব কতটা ক্রেতার ওপর পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সম্প্রতি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ফলের দাম নিয়ে কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, শুল্ক পরিশোধের পরও মাল্টা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্যে আমদানি ব্যয় ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ডলারের বাজারের ওপর ভিত্তি করে ফলের শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার বিষয়ে কাজ চলছে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে মানুষকে বেশি বেশি ফল কেনায় উৎসাহিত করতে চায় সরকার বলেও জানান তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তার সুফল ক্রেতারা কতটা পাবেন, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয় ও বাজারের অন্যান্য খরচের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে দাম কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তার ওপর। শুল্ক কমলেও যদি পরিবহন, সংরক্ষণ, মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রির পর্যায়ে দাম যথাযথভাবে সমন্বয় না হয়, তাহলে সাধারণ ক্রেতার ব্যয় প্রত্যাশিত মাত্রায় কমবে না। এ ক্ষেত্রে বাজার তদারকি, আমদানি ও বিক্রয়মূল্যের স্বচ্ছতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

ফল শুধু শৌখিন খাবার নয়; সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দাম বেশি হলে তা নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাজারে ফলের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিসংশ্লিষ্ট ব্যয় পর্যালোচনা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় ফলের উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

ক্রেতাদের কাছে বিষয়টি অবশ্য নীতিনির্ধারণের হিসাবের চেয়েও বেশি বাস্তব। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার আগে কয়েক কেজি ফল কেনার সামর্থ্য থাকবে কি না, অসুস্থ স্বজনের জন্য কমলা বা মাল্টা কেনা যাবে কি না, কিংবা পরিবারের শিশুদের জন্য নিয়মিত ফল রাখা সম্ভব হবে কি না এসব প্রশ্নই তাঁদের প্রতিদিনের হিসাবের অংশ। বাজারে ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না এলে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে। তাই ফলের বাজারে দাম কমানো ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর উদ্যোগ এখন ক্রেতাদের অন্যতম প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ