বিশ্বজুড়ে ঋণের পাহাড়, সুদ পরিশোধের চাপে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাত

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর ঋণ বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের সরকারি বাজেটে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ইনস্টিটিউটের (আইআইএফ) ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গ্লোবাল ডেট মনিটর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। জুনের শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। এই হিসাবের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ঋণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ, এটি শুধু সরকারি ঋণের হিসাব নয়; বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ।

ঋণ বৃদ্ধির এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ সুদহার, বাজেট ঘাটতি এবং পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন। ফলে অনেক দেশের সরকারকে উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি আগের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। সরকারি রাজস্বের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ ঋণদাতাদের পরিশোধ করতে হলে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য হাতে থাকা অর্থ কমে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ঋণের চাপ আর কেবল আর্থিক বাজার কিংবা সরকারের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এবং শিশুদের শিক্ষার ওপর পড়তে পারে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৬ সালের আ ওয়ার্ল্ড অব ডেট প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে প্রায় ৯৯৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ২০১০ সালের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় তিন গুণ। একই সঙ্গে ৫১টি উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী প্রায় ৩৭০ কোটি মানুষের ক্ষেত্রে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষা খাতের সরকারি ব্যয়ের যেকোনো একটির চেয়ে বেশি।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ঋণসংকটের প্রভাব শুধু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। সরকারকে ঋণদাতাদের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সুদ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমানো হলে তার প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নে। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, ওষুধ সরবরাহ, টিকাদান কর্মসূচি এবং দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা সহায়তার মতো কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ঋণের সুদ বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিলে সুদের হার নির্ভর করতে পারে বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলো সাধারণত তুলনামূলক কম সুদে ঋণ সংগ্রহ করতে পারে। বিপরীতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল রাজস্বব্যবস্থা কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা দেশগুলোকে অনেক সময় বেশি সুদ দিতে হয়।

উচ্চ সুদহারের আরেকটি সমস্যা হলো পুরোনো ঋণ নবায়ন বা পুনঃঅর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি। কোনো সরকার আগে কম সুদে ঋণ নিয়ে থাকলেও সেই ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ঋণ নিতে গিয়ে বেশি সুদের মুখোমুখি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে নতুন ঋণ নেওয়া অব্যাহত থাকলে মোট ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ে। এতে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ে, আর সেই ব্যয় মেটাতে আবার ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এভাবে ঋণ ও সুদের ব্যয় পরস্পরকে বাড়িয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ঋণ প্রায় ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ১১০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বৃদ্ধিতে চীনের বড় ভূমিকা ছিল। একই সময়ে উন্নত অর্থনীতিগুলোর মোট ঋণ ছিল প্রায় ২৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে বিশ্বব্যাপী ঋণ বৃদ্ধির চাপ শুধু দরিদ্র দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের ব্যয় সামলাতে হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব দেশে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে সরকারের নতুন ঋণ সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থের চাহিদা বাড়ছে। এসব প্রয়োজনের সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের প্রতিযোগিতা তৈরি হলে সরকারি বাজেটে অগ্রাধিকার নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে ঋণের পরিমাণ বাড়লেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কোনো দেশ ঋণ নিয়ে যদি উৎপাদনশীল অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান তৈরিতে কার্যকর বিনিয়োগ করে, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি রাজস্ব বাড়তে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না, রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকে কিংবা ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় অর্থনীতির আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে কর বাড়ানো, নতুন ঋণ নেওয়া কিংবা ব্যয় সংকোচনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ ব্যয়বহুল হলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে বৈদেশিক ঋণের ধরন, সুদের হার, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতার ওপর। বিশ্বব্যাপী ঋণ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে এককভাবে বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি নির্ধারণ করা যায় না।

আঙ্কটাডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর কাছাকাছি সুদহারে ঋণ নিতে পারত, তাহলে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার সুদ ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। এই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যেত। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানো, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশ্বের ঋণ পরিস্থিতি সামাল দিতে তাই শুধু নতুন ঋণ সীমিত করাই যথেষ্ট নয়। ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেই অর্থ থেকে কতটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের শর্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। দরকার হলে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস এবং সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, বিশ্বে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ জমা হওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। এই ঋণের পুরোটা সরকারি নয় এবং সব ঋণই যে সংকটের কারণ, তা-ও নয়। কিন্তু সুদের ব্যয় যখন সরকারের আয় ও ব্যয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে, তখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক সেবায় অর্থায়ন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ঋণ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত তাই শুধু আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ জীবনমানের সঙ্গেও জড়িত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ