পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী ও হাতবদলে বাড়ছে দাম; বাড়তি খরচের চাপে বিপাকে ক্রেতা-বিক্রেতা
রাজধানীর পাইকারি বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। পরিবহন ভাড়া, টোল, শ্রমিকের মজুরি, আড়তের কমিশন এবং একাধিক হাতবদলের কারণে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত না হওয়ায় কয়েকটি পণ্যের দাম রয়েছে চড়া। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পাকা ও কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৪০ টাকায়। মানভেদে দেশি গাজরের দাম ১০০ টাকা এবং চায়না গাজর ১৬০ টাকা। লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগাম শিমের দাম ১২০ থেকে ১৬০ টাকা এবং দেশি শসা ১২০ টাকা কেজি।
এ ছাড়া উচ্ছে, করলা, কাঁকরোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বরবটি, কচুর লতি ও কচুরমুখী বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০ টাকায়। চিচিঙ্গা ও ধুন্দুলের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মূলা ও হাইব্রিড পটল ৬০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা কেজি। মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে কাঁচা মরিচের দাম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং ধনেপাতা ২০০ টাকা কেজি। আকার ও মানভেদে প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা। চালকুমড়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি প্রায় ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি হালি কাঁচা কলা ও লেবুর দাম ৫০ টাকা।

রাজধানীর সাদেক খান পাইকারি আড়তে মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সবজি আসছে। সেখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা সবজি কিনে নিয়ে যান। তবে আড়ত ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
আড়তে প্রতি আঁটি কলমিশাক ৩ টাকা, লালশাক ৬ টাকা, পাটশাক ৭ টাকা, মূলাশাক ১০ টাকা এবং পুঁইশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ঢেঁড়সের দাম ২৫ টাকা। ফুলকপি প্রতি পিস ৩২ থেকে ৩৫ টাকা এবং লাউ ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাঁচ কেজির এক পাল্লা পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। একই পরিমাণ উচ্ছে ১৫০ টাকা, বরবটি ১৮০ টাকা, ধুন্দুল ২২০ টাকা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল ২৫০ টাকা, বেগুন ৩০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩২০ টাকা এবং শিম ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি বাজারের এসব দর ও খুচরা বাজারের বিক্রয়মূল্য তুলনা করলে কয়েকটি সবজিতে বড় ব্যবধান দেখা যায়। তবে পণ্য পরিবহন, বাছাই, নষ্ট হওয়া পণ্য এবং বিক্রেতার অন্যান্য খরচ হিসাব না করে শুধু দুই বাজারের দামের পার্থক্যকে নিট মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
সাদেক খান আড়তের মেসার্স তারানগর বাণিজ্যালয়ের বিক্রেতা মো. আরিফ বলেন, কাঁচামালের দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আড়তে পাঁচ কেজি বেগুন ৩০০ টাকা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল ২৫০ টাকা এবং ধুন্দুল ২২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আড়তের কমিশন ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ ৩ থেকে ৪ শতাংশ খরচ হয় বলে জানান তিনি।
খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার প্রসঙ্গে আরিফ বলেন, তাঁরা কম দামে কিনতে পারলে কম দামেও বিক্রি করতে পারেন। তবে অনেক বিক্রেতা অল্প পুঁজি নিয়ে বেশি লাভের প্রত্যাশা করেন। তাঁর মতে, খুচরা পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে বিক্রেতাদের নিজস্ব লাভের হিসাবও ভূমিকা রাখে।

আড়তদারদের দাবি, সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে পরিবহন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে গাড়িভাড়া, পথে টোল এবং শ্রমিকের খরচ বহন করতে হয়। এসব ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়।
এক আড়তদার বলেন, পরিবহন ব্যয়ের তুলনায় আড়তের কমিশন সীমিত। আগে যে গাড়ি ১৫ হাজার টাকায় ঢাকায় আসত, এখন সেটির ভাড়া ২০ হাজার টাকায়ও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, কৃষক অনেক সময় উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম পান না। কিন্তু কৃষকের কাছ থেকে স্থানীয় পাইকার, সেখান থেকে ঢাকার পাইকার এবং পরে খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি পর্যায়ে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায়।
বাবুল এন্টারপ্রাইজের এক আড়তদারও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আগে বগুড়া থেকে ঢাকায় সবজি আনতে গাড়িভাড়া ছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা হয়েছে। অন্যান্য রুটেও দূরত্বভেদে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে জানান তিনি।
তাঁর দাবি, সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি মাসে সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে এই ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে। তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে খুচরা বাজারে প্রতিটি সবজির দাম কতটা বেড়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব তিনি দেননি।
রাজধানীর রায়েরবাজারের সবজি বিক্রেতা রমজান আলী বলেন, পাইকারি বাজার থেকে যে দামে সবজি কিনতে হয়, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে সেই অনুযায়ী খুচরা বাজারে বিক্রি করতে হয়।
তিনি বলেন, এক পাল্লা টমেটো ৫০০ টাকায় কিনে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। কাঁচা মরিচের দাম নিচ্ছেন কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা। আকার ও মানভেদে প্রতিটি লাউ বিক্রি করছেন ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।
রমজান আলীর ভাষ্য, শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত না হওয়ায় দাম তুলনামূলক বেশি। পাইকারি বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও বলেন, সবজি পচনশীল পণ্য হওয়ায় বিক্রেতারা সাধারণত অল্প পরিমাণে কেনেন এবং দিনের মধ্যেই বিক্রি করার চেষ্টা করেন। এক দিন অবিক্রীত থাকলে পরদিন সবজির সতেজতা ও মান কমে যায়। তখন কম দামে বিক্রি করতে হয়, কখনো লোকসানও গুনতে হয়।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিক্রি কমে গেলে অনেক সময় দাম কমিয়ে দিতে হয় বলেও জানান তিনি। এতে প্রত্যাশিত মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অবিক্রীত সবজি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্যের পেছনে পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি, আড়তের কমিশন, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক পর্যায় কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি শীতকালীন সবজির সরবরাহ এবং বাজারে চাহিদার পরিবর্তনও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রতিটি কারণের সুনির্দিষ্ট আর্থিক হিসাব এবং বিভিন্ন বাজারের একই দিনের দর তুলনা ছাড়া কোন উপাদান কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন।
এদিকে টমেটো, গাজর, শিম, বেগুন ও কাঁচা মরিচের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি উচ্চ দামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বাজারের বিভিন্ন স্তরে খরচ বাড়ার ব্যাখ্যা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। ফলে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খাদ্যব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।