মানবদেহের কাঠামো গড়ে তোলা হাড় আমাদের দাঁড়াতে, হাঁটতে, চলাফেরা করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। হাড় শুধু শরীরকে আকৃতি দেয় না, বরং গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গকে সুরক্ষা দেয় এবং শরীরের চলাচলে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা নানা শারীরিক ও জীবনযাপনজনিত কারণে এই হাড়ই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার এ সমস্যার নাম অস্টিওপোরোসিস। রোগটি অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। যখন প্রথমবার হাড় ভাঙে, তখনই অনেক মানুষ বুঝতে পারেন যে তাঁদের হাড়ের শক্তি কমে গেছে।
হাড়ের এই নীরব ক্ষয় সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো অস্টিওপোরোসিস ও বিপাকীয় হাড়ের রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা। আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী এ দিবস ঘিরে সচেতনতামূলক প্রচার, আলোচনা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস কেবল একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক দিবস নয়; এটি মানুষকে নিজের হাড়ের যত্ন নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কারণ, হাড়ের সুস্থতা অবহেলা করলে জীবনের পরবর্তী সময়ে চলাফেরার স্বাধীনতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে হাড়ের ঘনত্ব ও অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং সামান্য আঘাত, পড়ে যাওয়া কিংবা কখনো দৈনন্দিন কাজের চাপেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। সাধারণত কোমরের হাড়, মেরুদণ্ড ও কবজিতে এ ধরনের ভাঙন বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোমরের হাড় ভেঙে গেলে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে এর পরিণতি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতি।
অস্টিওপোরোসিসের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত এর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। হাড় দুর্বল হলেও অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। মেরুদণ্ডের হাড়ে ছোট ছোট ভাঙন ঘটলে পিঠে ব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া কিংবা শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু এসব লক্ষণকে অনেক সময় বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে উপেক্ষা করা হয়।
তাই শুধু ব্যথা অনুভব করলেই হাড়ের রোগ শনাক্ত করা সম্ভব এমন ধারণা সঠিক নয়। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করা জরুরি।
বয়স বৃদ্ধি অস্টিওপোরোসিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তবে এটি শুধু প্রবীণদের রোগ নয়। অল্প বয়সে অপুষ্টি, দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব, নির্দিষ্ট কিছু রোগ এবং কিছু ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারও হাড়ের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমতে পারে। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে। যাঁদের পরিবারে অস্টিওপোরোসিস বা কোমরের হাড় ভাঙার ইতিহাস রয়েছে, তাঁদেরও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া শরীরের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম থাকা, খাদ্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির ঘাটতি, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ এবং কিছু প্রদাহজনিত রোগও হাড়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে কারও অস্টিওপোরোসিস হবে, এমন নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য রোগ বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হয়।
হাড়ের সুস্থতা রক্ষায় পুষ্টিকর খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাড় গঠন ও শক্তিশালী রাখতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিন প্রয়োজন। দুধ, দই, ছোট মাছ, ডাল, বাদাম, ডিম এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। খাবারের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে হবে।
ক্যালসিয়াম হাড়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। অন্যদিকে ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। তাই শুধু ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলেই হবে না, শরীরে ভিটামিন ডির ঘাটতি রয়েছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে। নিরাপদ সময়ে পরিমিত সূর্যালোক গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
অনেকেই হাড় শক্ত করার আশায় নিজের ইচ্ছায় ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডির ওষুধ খেতে শুরু করেন। কিন্তু সবার জন্য একই মাত্রার সম্পূরক প্রয়োজন হয় না। অতিরিক্ত মাত্রায় এসব গ্রহণেরও ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে পারে। তাই খাদ্যাভ্যাস, বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূরক গ্রহণ করা উচিত।
হাড় ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের বিকল্প নেই। হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, পেশি শক্তিশালী করার উপযোগী ব্যায়াম এবং শরীরের ভারসাম্য উন্নত করার অনুশীলন হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে। তবে বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং আগে হাড় ভাঙার ইতিহাস রয়েছে কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে ব্যায়ামের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
যাঁদের ইতিমধ্যে অস্টিওপোরোসিস রয়েছে, তাঁদের জন্য সব ধরনের ব্যায়াম নিরাপদ নয়। বিশেষ করে মেরুদণ্ডের হাড় দুর্বল হলে অতিরিক্ত ভার তোলা কিংবা ভুলভাবে শরীর বাঁকানোর ব্যায়াম বিপজ্জনক হতে পারে। এ কারণে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করা জরুরি।
পাশাপাশি ঘরে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। বাথরুম ও চলাচলের পথে পিচ্ছিল অবস্থা দূর করা, পর্যাপ্ত আলো রাখা, প্রয়োজন হলে হাতল স্থাপন এবং চলাচলের পথে অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে রাখা উচিত। প্রবীণদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি, ভারসাম্য ও চলাফেরার সমস্যার যথাযথ মূল্যায়নও প্রয়োজন।
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর বয়স, উপসর্গ, পূর্ববর্তী হাড় ভাঙার ঘটনা, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপের পরীক্ষা করা হয়। এ ক্ষেত্রে ডিএক্সএ বা দ্বৈত-শক্তির এক্স-রে শোষণমাত্রা পরীক্ষা বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। পরীক্ষার ফল ও সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন।
যাঁদের সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙেছে, দীর্ঘদিন ধরে পিঠে ব্যথা হচ্ছে, উচ্চতা কমে যাচ্ছে কিংবা শরীর ক্রমশ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তাঁদের বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে মধ্যবয়সের পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত হলে ভয় পেয়ে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রোগের মাত্রা ও ব্যক্তির ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ, পুষ্টি, ব্যায়াম এবং পড়ে যাওয়া প্রতিরোধের সমন্বিত পরিকল্পনা দিতে পারেন। যথাযথ চিকিৎসা হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে এবং স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ ও কর্মক্ষম বার্ধক্য নিশ্চিত করার গুরুত্বও বাড়ছে। হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি তাই পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তবে দেশে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা, ঝুঁকির বিস্তার ও চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য ছাড়া রোগটির ব্যাপকতা নিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় হাড়ের রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা বাড়াতে পারে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো। বয়স্ক ব্যক্তি ও মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের হাড়ের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে হাড় ভাঙার পর শুধু ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; কেন হাড় ভাঙল, অস্টিওপোরোসিস রয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা প্রতিরোধে কী করা প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, ঝুঁকি নিরূপণ, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক প্রচার মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের প্রচারাভিযানেও শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে হাড়ের যত্ন নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রস্তুতি শুধু বৃদ্ধ বয়সে শুরু করলে চলবে না; শৈশব ও কৈশোর থেকেই পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
অস্টিওপোরোসিসের কারণে হাড় ভাঙা মানে শুধু শারীরিক আঘাত নয়; অনেক সময় এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় দীর্ঘদিনের কষ্ট, চিকিৎসার ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা। যে মানুষটি একসময় নিজের সব কাজ নিজেই করতেন, তাঁকেও কখনো কখনো সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। পরিবারের সদস্যদের জন্যও এটি মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই হাড়ের যত্নকে বয়সের শেষ পর্যায়ের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান পরিহার, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে হাড়ের সুস্থতা রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।
২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক হাড়ের নীরব ক্ষয়কে অবহেলা নয়, বরং সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে মোকাবিলা করা। নিজের হাড়ের যত্ন নেওয়া, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের খোঁজ রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে সুস্থ, সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ভিত্তি। কারণ, শক্ত হাড় শুধু শরীরকে ধরে রাখে না, মানুষকে ধরে রাখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা ও জীবনের আনন্দের সঙ্গে।