নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে দিশেহারা ক্রেতা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে আবারও চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে আদা, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির দামে স্বস্তি নেই। কোনো কোনো পণ্যের দাম সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও সামগ্রিক বাজারে তার প্রভাব খুব একটা পড়ছে না। বরং একসঙ্গে একাধিক পণ্যের বাড়তি দামে মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
ঢাকার বিভিন্ন বাজারদরের তথ্যে দেখা যায়, খামারের মুরগি বর্তমানে কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা, ফার্মের লাল ডিম প্রতি ডজন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার সমপরিমাণ দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা, দেশি রসুন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং আমদানি করা রসুন ১৯০ থেকে ২১০ টাকা কেজি। দেশি আদা ১৫৫ থেকে ১৭৫ টাকা এবং আমদানি করা আদা ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি পর্যন্ত রয়েছে।
চাল, ডাল ও তেলের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। সরু আমন চাল কেজি ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা এবং মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বোরো সরু চালের দাম ৬৬ থেকে ৭০ টাকা, মাঝারি ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা এবং মোটা চাল ৪৭ থেকে ৪৯ টাকা। প্যাকেটজাত আটার দাম কেজি ৫৮ থেকে ৬১ টাকা। মুগ ডাল ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, ছোলা ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, চিনি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে ২০৫ টাকা কেজি বা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সবজির দামও বেশ চড়া। পেঁপে ছাড়া অনেক সবজিই ৫০ টাকার ওপরে। কয়েকটি সবজির দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। ফলে কম দামের সবজি দিয়ে সংসারের বাজার সামাল দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সবজির পাশাপাশি মাছ, মাংস ও ডিমের দামও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাজারে পণ্যভেদে দামের পার্থক্য থাকলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, একসঙ্গে এতগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে একটি পরিবার নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে সপ্তাহের বাজার শেষ করতে পারত, এখন একই পরিমাণ পণ্য কিনতে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মাছ-মাংস কমিয়ে দিয়েছে, ডিম ও মুরগিও প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছে। সবজির ক্ষেত্রেও পছন্দের পণ্য বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনছেন অনেকে।
একজন ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে সবকিছুর দাম বাড়লে আমরা কীভাবে চলব? আয় তো সেই হারে বাড়ছে না। বাজারে এসে প্রতিদিনই নতুন দাম শুনতে হচ্ছে।’
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ অন্যান্য ব্যয় অপরিবর্তিত বা বাড়তি থাকায় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সবার আগে খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। দিনমজুর, রিকশাচালক, ছোট ব্যবসায়ী ও সীমিত বেতনের চাকরিজীবীদের বড় অংশের আয় নির্দিষ্ট থাকলেও বাজারদর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, সংরক্ষণ ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন খরচও পণ্যের খুচরা দামে যুক্ত হচ্ছে। আবার ক্রেতাদের অভিযোগ, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে বেশি হওয়ায় বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জেলার বাজারচিত্রেও পণ্যভেদে দামের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। কোথাও সবজির সরবরাহ বাড়ায় কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে, আবার কোথাও বৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটে বেগুন, কাঁচামরিচসহ কিছু সবজির দাম বেড়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন বাজারে একই পণ্যের দামে পার্থক্যও তৈরি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কোনো একটি পণ্যের দাম কমিয়ে বাজারে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মজুত ও কারসাজি বন্ধ করা এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জরুরি। একই সঙ্গে কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তাকেও অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে না হয় এমন একটি কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ বাজারে একসঙ্গে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের বাজার খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান, পুষ্টি, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক পারিবারিক অর্থনীতিও জড়িয়ে পড়ে। তাই নিত্যপণ্যের বাজারে স্থায়ী স্বস্তি ফেরানো এখন সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ