১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস

দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস: নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে চাই সমন্বিত প্রস্তুতি

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

প্রকৃতি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কিংবা মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট নানা বিপর্যয় মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবনযাত্রা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, খরা ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির পরও দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তবে যথাযথ পরিকল্পনা, কার্যকর প্রস্তুতি, জনসচেতনতা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ বাস্তবতা সামনে রেখেই প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস।

দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সচেতন করা এবং এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে দুর্যোগের কারণে মানুষের প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়। শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নয়, বরং দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং মানুষের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল দর্শন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৯ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক দশক পালনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৩ অক্টোবরকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। ২০০২ সালে সাধারণ পরিষদ দুর্যোগ প্রতিরোধ, প্রশমন, প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসের বৈশ্বিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিবসটির বার্ষিক পালন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ২০০৯ সালে ১৩ অক্টোবরকে দিবসটির স্থায়ী তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করে নাম পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস রাখা হয়। এর মধ্য দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং মানুষের দুর্বলতা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ঝুঁকি তৈরির সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণগুলোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দুর্যোগ বলতে আমরা সাধারণত এমন কোনো আকস্মিক ঘটনাকে বুঝি, যার ফলে মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কেবল প্রাকৃতিক ঘটনার তীব্রতার ওপর নির্ভর করে না। একটি ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানলে কত মানুষ মারা যাবেন, কত ঘরবাড়ি ধ্বংস হবে কিংবা কত পরিবার নিঃস্ব হবে, তা নির্ভর করে আশ্রয়কেন্দ্রের প্রাপ্যতা, আগাম সতর্কবার্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, ঘরবাড়ির নির্মাণমান, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতির ওপরও। একই মাত্রার দুর্যোগ কোনো এলাকায় সীমিত ক্ষতি করতে পারে, আবার অন্য এলাকায় ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। তাই দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে বিপদের পাশাপাশি মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান ও মোকাবিলার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ বদ্বীপ, অসংখ্য নদনদী, ঘনবসতি, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং মৌসুমি জলবায়ুর কারণে দেশটি নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। কোথাও কৃষিজমি তলিয়ে যায়, কোথাও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় জনপদ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ মানুষের প্রস্তুতি বাড়াতে সহায়তা করেছে। অতীতের অনেক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে প্রাণহানি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই অগ্রগতি আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে না। কারণ ঝুঁকির ধরন বদলাচ্ছে, জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে, নগরায়ণ দ্রুত হচ্ছে এবং নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অতএব অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম সতর্কবার্তা এবং মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সতর্কবার্তা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; মানুষ সেটি বুঝতে পারছেন কি না, কী করতে হবে জানেন কি না এবং নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত সম্পর্কে অনেকের ধারণা থাকলেও সংকেতের অর্থ, নিরাপদে যাওয়ার সময় কিংবা গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় সম্পদ রক্ষার উপায় সম্পর্কে বিভ্রান্তি থাকতে পারে। তাই সহজ ভাষায় সতর্কবার্তা প্রচার, স্থানীয় পর্যায়ে মহড়া এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি।
দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরের আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবসের প্রতিপাদ্য যার বাংলা ভাবার্থ ‘সহনশীলতার শুরু ঘর থেকেই’। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয় ২০২৬ সালের দিবসের জন্য এই প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন, ঝুঁকি সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং পরিবারের নিজস্ব প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি বাড়ি শুধু বসবাসের জায়গা নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, সঞ্চয়, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। দুর্যোগে বাড়ি ধ্বংস হলে একটি পরিবার শুধু আশ্রয় হারায় না, অনেক সময় হারায় জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
বাংলাদেশে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে। নদীর তীর, চরাঞ্চল, উপকূলীয় নিম্নভূমি, পাহাড়ের ঢাল কিংবা জলাবদ্ধ এলাকাতেও মানুষ বসতি গড়ে তুলতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের প্রয়োজন এবং নিরাপদ জমির উচ্চমূল্য মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসে ঠেলে দেয়। ফলে শুধু মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে বললে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিকল্প আবাসন, কর্মসংস্থান, মৌলিক সেবা এবং পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণের নিয়ম মানা, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা জরুরি।

নগরাঞ্চলেও দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, খাল দখল, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং দুর্বল ভবন ব্যবস্থাপনা নানা ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ায়। অল্প সময়ের অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে সড়ক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ভবন নির্মাণবিধি কার্যকর করা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খোলা জায়গা সংরক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারপথ সচল রাখা প্রয়োজন।

দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রকৃতির সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন, বিশেষ করে সুন্দরবন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখে। নদী, খাল, জলাভূমি ও বনভূমি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে। কিন্তু এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মানুষের বিপদাপন্নতা বাড়ে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা, নদী ও জলাভূমি রক্ষা করা, বন উজাড় বন্ধ করা এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা না করে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, উপকূলীয় লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মানুষের জীবন ও জীবিকায় চাপ সৃষ্টি করছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় একদিকে যেমন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে, অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল ফসল, পানি সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা, লবণাক্ততা সহনশীল কৃষিপদ্ধতি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে প্রতিটি দুর্যোগের পর তাঁদের নতুন করে নিঃস্ব হতে না হয়।

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় শিক্ষা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া আয়োজন করা দরকার। ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদে থাকতে হবে, অগ্নিকাণ্ডে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হবে, বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানি কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিশুদের পাশাপাশি পরিবারের প্রবীণ সদস্যদেরও প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি পরিবার জরুরি যোগাযোগের নম্বর, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, টর্চ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে পারে। ছোট ছোট এসব পদক্ষেপ দুর্যোগের মুহূর্তে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের আগে সতর্কবার্তা প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম জনসচেতনতা বাড়াতে পারে। তবে যাচাই না করা খবর, গুজব কিংবা অতিরঞ্জিত তথ্য আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং উদ্ধারকাজে বাধা দিতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি সতর্কবার্তা যথাযথভাবে প্রচার করাও জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়ন। দুর্যোগের পর ত্রাণ, পুনর্গঠন ও ক্ষতিপূরণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কার, নিরাপদ আবাসন, সতর্কীকরণব্যবস্থা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগে বিনিয়োগ করা গেলে অনেক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। সরকারি বাজেটে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন। বেসরকারি খাতকেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ঝুঁকি সহনশীল অবকাঠামো এবং জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও জনগোষ্ঠীর ন্যায্য প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

তবে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না, যদি স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা না যায়। একটি এলাকার মানুষই সবচেয়ে ভালো জানেন, সেখানে কখন বন্যা হয়, কোন পথ দিয়ে পানি প্রবেশ করে, কোথায় আশ্রয় নেওয়া যায় এবং কোন পরিবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবক, কৃষক, জেলে, নারী, তরুণ ও নাগরিক সংগঠনকে দুর্যোগ পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে ২০১৫ সালে গৃহীত সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্কে ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্যোগজনিত প্রাণহানি, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিপর্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এই লক্ষ্য অর্জনে দুর্যোগের ঝুঁকি বোঝা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগ এবং প্রস্তুতি ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শক্তিশালী করা অপরিহার্য। বাংলাদেশকেও নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা প্রতীকী কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগকে সব সময় ঠেকানো না গেলেও এর ভয়াবহতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একটি নিরাপদ বাড়ি, কার্যকর সতর্কবার্তা, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, সুরক্ষিত পরিবেশ, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সচেতন জনগোষ্ঠী সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে দুর্যোগ সহনশীল সমাজ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো মানে শুধু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা নয়; এর অর্থ জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত রাখা। যে পরিবার দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যে গ্রাম আগাম সতর্কবার্তা পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে এবং যে শহর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে দুর্যোগ সহনশীল। তাই আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা। কারণ নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে আজই, প্রতিটি পরিবার থেকে, প্রতিটি ঘর থেকে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ