প্রকৃতির সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেক্স 

দিল্লিতে বিক্ষোভের আগুন, কঠোর নিরাপত্তায় রাজধানী-আটকের পর ফের রাস্তায় আন্দোলনকারীরা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং কয়েকটি ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন। শনিবার (১০ অক্টোবর) ব্যাপক ধরপাকড়, সড়কে ব্যারিকেড এবং গণপরিবহনে বিধিনিষেধের পর রোববারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার রাখা হয়েছে। আটক হওয়ার পর আন্দোলনের নেতারা মুক্তি পেলেও নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। ফলে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসাধারণের চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক থেকে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে সংখ্যালঘু ও বিরোধী রাজনৈতিক মতের ভোটাররা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ অভিযোগের জেরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি উঠেছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পক্ষপাত বা কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, দ্বৈত নিবন্ধিত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়ার জন্যই যাচাই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, যাচাই কার্যক্রমে প্রায় ১৩ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের সন্ধান না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। নাম বাদ দেওয়ার কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থা এবং পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ এসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন সমালোচকেরা।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। আন্দোলনের অন্যতম নেতা অভিজিৎ দীপকে ও তাঁর দুই সহযোগী সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রানকাকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক বছরের জন্য শান্তি বজায় রাখার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে ওই শর্তের সুনির্দিষ্ট অর্থ এবং ভবিষ্যতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।
শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দুই হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছিল বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের কয়েকজন প্রতিনিধিও ছিলেন। জंतर মন্তরে পৌঁছাতে বাধা পেয়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ দিল্লির অন্য এলাকায় ছোট ছোট দলে বিক্ষোভ করে। দখলদারত্ব বা সহিংসতার অভিযোগের বদলে এসব ঘটনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে কী ঘটেছে, কতজন আটক হয়েছেন এবং পুলিশের পদক্ষেপ কী ছিল তা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায়ও। শনিবার দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে ১১ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি মেট্রোর সব স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এবং আন্তলাইন পরিবর্তনের সুবিধাও চালু রয়েছে। উত্তর রেলওয়ে জানিয়েছে, রোববার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার কথা। যদিও কেন্দ্রীয় দিল্লির বিক্ষোভপ্রবণ এলাকায় সড়ক চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ বা যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আসতে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বিশেষ শুনানি করেছে। আদালত জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু অপ্রয়োজনে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত করা উচিত নয়। প্রয়োজন না থাকলে ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়া এবং নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভের সময় আটক, পুলিশের পদক্ষেপ ও পরিবহনব্যবস্থায় বিধিনিষেধ নিয়ে দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব এবং দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনের কাছে জবাবও চেয়েছে আদালত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি মানবাধিকার সংস্থা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বক্তব্যকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু নির্বাচন পরিচালনার স্বচ্ছতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; নাগরিক অধিকার, প্রতিবাদের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
১১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত রয়টার্সের প্রতিবেদনে দিল্লিতে বিক্ষোভ তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে আন্দোলনের নেতারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং পুলিশও বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে রাজধানীর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। ভোটার তালিকা সংশোধনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বাদ পড়া ভোটারদের জন্য কার্যকর প্রতিকার এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় আইনসম্মত পদক্ষেপ এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে দিল্লির পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ