তৃণমূল থেকে ‘অপসারিত’ মমতা, দলের নতুন চেয়ারম্যান অরূপ

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরজয়ের পর থেকেই দলের ভেতরে ও বাইরে নানামুখী চাপ ও টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে এবার দল থেকেই মমতাকে কার্যত অপসারণ করেছে বিদ্রোহীরা।

সোমবার বিধানসভায় বাজেট অধিবেশন ছিল। সেই অধিবেশন শেষে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা নিউ টাউনের সেই হোটেলে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের ৬০ জন বিধায়ক। এ ছাড়াও, কলকাতার প্রায় ৭০ জন প্রাক্তন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। ওই বৈঠকেই ‘তৃণমূলের’ ৩০ জনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নতুন কমিটিতে দলের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে অরূপ রায়কে; সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যপর্যায়ে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে মোট ৩ জনকে—জাভেদ খান (সাধারণ সম্পাদক ১), সন্দীপন সাহা (সাধারণ সম্পাদক ২), সাবিনা ইয়াসমিন (সাধারণ সম্পাদক ৩)।

উল্লেখ্য, সোমবার বিদ্রোহীদের বৈঠকে যে ব্যানার টাঙানো হয়েছিল তাতে মমতার ছবি ছিল না। মহাত্মা গান্ধী, বিআর আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছবি ছিল।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ‍ঋতব্রত বলেন, “তৃণমূলের দলীয় সংবিধানের ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে,  প্রতি তিন বছর পর পর জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক (কাউন্সিল) হবে; কিন্তু ২০২২ সালের পর আর তৃণমূলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়নি। সেই কারণে প্রস্তাব এনে আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের ফুলকি দেখা যায়। সেই ফুলকি ধীরে ধীরে বড়সড় আগুনের চেহারা নেয়। একে একে বিধায়কেরা বিদ্রোহ শুরু করেন।

বিদ্রোহের সূত্রপাত সইকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, এ নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, অভিষেক বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে তৃণমূল বিধায়কদের সই করা প্রস্তাবিত চিঠি পাঠান, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়।

সেই অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আনেন উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন। সেই নিয়ে টালবাহানা চলে বেশ কয়েক দিন। দলের মধ্যে ভাঙন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। তৃণমূলের রাশ আলগা হতে থাকে মমতার হাত থেকে। প্রথম পর্যায়ে একসঙ্গে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রতকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা করা হয়।

সেই শুরু তৃণমূলে ভাঙন। পরে একে একে ফিরহাদদের মতো মমতা-ঘনিষ্ঠেরাও বিদ্রোহ শিবিরে নাম লেখাতে শুরু করেন। শুধু তৃণমূলের পরিষদীয় দলে নয়, ভাঙন ধরে সংসদীয় দলেও। একসঙ্গে লোকসভার ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছাড়েন। ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া নামে এক রাজনৈতিক দলের হাত ধরেন তাঁরা। সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেবেরা রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন।

শুধু উঁচুতলায় নয়, তৃণমূলের নিচুতলার সংগঠনেও ভাঙন ধরতে থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। প্রশ্ন উঠতে থাকে, আসল তৃণমূল কোনটা? মমতার হাতে যে তৃণমূল আছে না কি ঋতব্রতের শিবির? সোমবারের বৈঠকে ঋতব্রতেরা স্পষ্ট দাবি করেছেন, তাঁরাই আসল আসল তৃণমূল। সেই বৈঠকে যোগ দিতে দেখা যায় মমতার তৈরি করে দেওয়া তৃণমূলের নতুন কমিটির রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পুত্র সৌরভ বসুকেও। তিনি কলকাতা পুরসভার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ছিলেন।

যদিও সোমবারের বৈঠককে গুরুত্ব দিতে নারাজ বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। মমতার কালীঘাটের বাড়ি থেকে বৈঠক সেরে বেরিয়ে তিনি বলেন, “তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। আমাদের দলের যা কাঠামো, তাতে এসব করার এক্তিয়ার ওদের (বিদ্রোহী) নেই।’’

এ প্রসঙ্গে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “পরিষদীয় দল আর পার্টি সংগঠন এক বিষয় নয়। এটা নিয়ে যা বলার আদালত বলবে। ঋতব্রতদের এত দিন বিশ্বাসঘাতক বলছিলাম। আজ বলছি ফোর টোয়েন্টি।’’ শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণের আরও সংযোজন, ‘‘সিপিএমের সংস্কৃতিই ছিল খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি। ও (ঋতব্রত) সেই সিপিএমের প্রোডাক্ট। ফলে এর থেকে বেশি আর কী হবে।”

সিপিএমের আইনজীবী নেতা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেছেন ‘‘ঋতব্রতেরা যে ভাবে এগোচ্ছেন তাতে স্পষ্ট একটি নকশা রয়েছে। অনেক সময় অনেক কোম্পানি লাটে উঠে যায়। তখন দেখা যায়, সেই কোম্পানির কিছু অংশের শেয়ার কিনে তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়। এটাও তেমনই। তৃণমূল নামক কোম্পানিটা উঠে গিয়েছে। এখন ঋতব্রতেরা শেয়ার কিনে নিয়ে তৃণমূল নামটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।’’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ