কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে সারা দেশে ধরপাকড়

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সাত দিনে আটক-গ্রেপ্তার আড়াই হাজার, নজরদারিতে মূলহোতারা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ দমনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়েছে। গত সাত দিনে (২৩–২৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় একযোগে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে রাজধানী ও ঢাকার আশপাশে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চলছে।
অভিযানে আটক হওয়া কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ অনেকেই বিভিন্ন মামলায় জড়িত আসামীও রয়েছে। বিভিন্ন জেলার পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অপরাধে সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। অনেককে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর এসআরবি-২ কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের একটি গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা সবুজ হোসেন আরমানকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর কাছ থেকে একটি সামুরাই উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে আরও চারটি সামুরাই এবং মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকায় একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব গ্রুপের মূলহোতা, নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং অপরাধী চক্রের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করাও অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য।
এর আগে রাজধানীর পল্লবীতে কিশোর গ্যাং ‘ভইরা-দে’ এর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিকের বাসায় গুলি চালানোর ঘটনায় ওই গ্রুপের এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘবদ্ধ তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন ১৩ জেলার অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ২৪ সেপ্টেম্বর কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে সমন্বিত ও গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতেও কিশোর অপরাধ দমনে অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২৪ সেপ্টেম্বরের আগে চিহ্নিত এক কিশোর গ্যাং নেতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, ম্যাগাজিন ও কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত সাত দিনের অভিযানে সবচেয়ে বেশি আটকের তথ্য পাওয়া গেছে কুমিল্লায়। ২৪ সেপ্টেম্বর এক রাতে জেলার ১৮ থানায় অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে একই ধরনের অভিযানে আরও ৪১৫ জনকে আটক করা হয়। অর্থাৎ প্রকাশিত দুই অভিযানের তথ্যেই কুমিল্লায় ১ হাজারের বেশি আটকের তথ্য পাওয়া যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাদের অনেককে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
২৭ সেপ্টেম্বর রাতে চাঁদপুরের আটটি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫৬ জনকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এ অভিযান চালানো হয়েছে।
একই সময়ে নোয়াখালীর বিভিন্ন থানায় ২৫টি অভিযানে ১৭১ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৬০ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২৭ সেপ্টেম্বর রাতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৬৪৫ জনকে আটক করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযানের মধ্যে কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর অভিযান ছিল উল্লেখযোগ্য।
অভিযানের পরিসর দেখে বোঝা যাচ্ছে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু নির্দিষ্ট কোনো শহর বা এলাকার ওপর নির্ভর না করে একাধিক জেলায় সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের পুনর্বাসন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অভিযানে আটক হওয়া অনেক কিশোরকে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং নির্মূল করা সম্ভব নয়। গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব, অর্থের উৎস, অস্ত্রের জোগান এবং প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ