ট্রাম্পের ‘ইরান যুদ্ধ’ ঠেকাতে ব্যর্থ মার্কিন সিনেট

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

ইরানের রণক্ষেত্রে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিসাইল হানা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তখন সেই যুদ্ধের উত্তাপ আছড়ে পড়েছে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটাল হিলেও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযান কি শুধুই ‘আত্মরক্ষা’, নাকি এটি কংগ্রেসের ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া এক স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে উত্তাল মার্কিন রাজনীতি। সম্প্রতি ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন সিনেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আনা হলেও, রিপাবলিকানদের প্রবল বাধায় তা ভেস্তে গেছে।

কংগ্রেস বনাম প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা

সিনেট ফ্লোরে কথা বলার সময় সিনেটর টিম কেইন যুক্তি দেন যে, গোপনীয় ব্রিফিংগুলোতেও ট্রাম্প প্রশাসন এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি যা দিয়ে প্রমাণ হয় যে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো ‘আসন্ন হামলার’ হুমকি ছিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি একে সামান্য এক আঘাত বলতে পারেন না যা যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে না; আর এটিও বলতে পারেন না যে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো স্থল সৈন্য নিয়োজিত নেই।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের সপক্ষে একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি দিয়ে আসছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করছিল— যা গত বছরের হামলায় ‘ধ্বংস’ হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি আগে দাবি করেছিলেন। এছাড়া ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, ইসরায়েল ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত আসতে পারে। তবে ট্রাম্প পরে এই দাবির উল্টো কথা বলেন; তিনি জানান, ইরানই মূলত ইসরায়েলে আসন্ন হামলার পরিকল্পনা করছিল।

রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ যুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের শত্রুতামূলক আচরণই প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়। তিনি দাবি করেন, ইরান গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ফের তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালুর চেষ্টা করায় প্রেসিডেন্ট এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ধোঁয়াশা

পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক অভিযান মাত্র শুরু হয়েছে এবং ওই অঞ্চলে আরও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। যুদ্ধের পরিধি বা সময়সীমা অস্পষ্ট থাকলেও ট্রাম্প ধারণা দিয়েছেন এটি ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ বা তার বেশি স্থায়ী হতে পারে। তবে সিনেটর রিশ আশাবাদী যে এটি কোনো ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ নয় এবং খুব দ্রুতই এর সমাপ্তি ঘটবে।

কেন এই ভোটাভুটি গুরুত্বপূর্ণ?

প্রস্তাবটি সিনেটে পাস হলেও আইন হওয়ার পথে অনেক বাধা ছিল। দুই কক্ষে পাস হওয়ার পর এটি প্রেসিডেন্টের কাছে স্বাক্ষরের জন্য যেত, যেখানে ট্রাম্প ‘ভেটো’ (বাতিল) ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। সেই ভেটো কাটাতে কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব।

তবুও, বিশ্লেষকরা মনে করেন এই ভোটাভুটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন’-এর হাসান এল-তায়াব বলেন, ‘এই মুহূর্তটি একটি ধ্রুব সত্যকে সামনে আনে— নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা পরীক্ষা করতে এবং অন্তহীন যুদ্ধ রোধ করতে কংগ্রেসকে অবশ্যই তার সাংবিধানিক ভূমিকা বারবার জাহির করতে হবে।’

অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘ডিমান্ড প্রগ্রেস’-এর সিভন খারজিয়ান বলেন, এই ভোটের রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে ভোটাররা মনে রাখবে যে— কারা একটি ‘অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয়’ যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তার মতে, যারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, তারা মূলত মার্কিন জনগণের ইচ্ছা এবং সেনাদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ