জ্বালানি খাতে গত আট মাসে সরকার ৪১২ কোটি মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। একই সময়ে আগের সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকটকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন উপদেষ্টা।
সম্প্রতি রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নূরুল কাদের অডিটোরিয়ামে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টার বক্তব্যে দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, জ্বালানি খাতে সরকারি ব্যয়, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ মোকাবিলায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি জানান, করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে জনগণের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, আগের সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে। তবে এ ধরনের কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বজায় রাখা জরুরি।
জ্বালানি খাতে আট মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকির তথ্য তুলে ধরে উপদেষ্টা সরকারের ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এনেছেন। জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সামাল দিতে ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ ব্যয়ের কার্যকারিতা, আর্থিক চাপ এবং সাধারণ মানুষ ও উৎপাদন খাতের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে ২০২৯ সালে উত্তরণের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সংস্কার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও এ অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এর সঙ্গে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত হবে। বিশেষ করে রফতানিতে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন হবে।
এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকশিল্পসহ রফতানিমুখী খাতগুলোর প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। উপদেষ্টা বলেন, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিজিএমইএ, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু ভর্তুকি বা সামাজিক সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব হবে।