চ্যাটজিপিটি দিয়ে সাংবাদিকতা: পেশায় প্রবেশের সুযোগ কতটুকু?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশে সাংবাদিকতার জগতে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। সংবাদ লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন তৈরি, নথি পর্যালোচনা ও সংবাদ সম্পাদনার মতো কাজে এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে চ্যাটজিপিটি। এতে সাংবাদিকতার কাজ শেখা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে জানলেই কি সাংবাদিক হওয়া সম্ভব? নাকি পেশাদার সাংবাদিক হতে এখনো প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধানী দক্ষতা ও নৈতিকতার চর্চা?

বাস্তবতা হলো, চ্যাটজিপিটি সাংবাদিকতার নতুন দরজা খুলছে, কিন্তু সাংবাদিক হওয়ার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। প্রযুক্তিটি একজন আগ্রহী মানুষকে সংবাদ তৈরির বিভিন্ন ধাপ শিখতে সহায়তা করতে পারে। তবে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্যের সত্যতা যাচাই, মানুষের বক্তব্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার দায়িত্ব এখনো সাংবাদিকেরই।

সাংবাদিকতার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যে বাড়ছে, তার আন্তর্জাতিক প্রমাণও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৪ জন সাংবাদিকের ওপর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এক জরিপের ফল ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম। জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ সাংবাদিক পেশাগত কাজে সপ্তাহে অন্তত একবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন। ২৭ শতাংশ সাংবাদিক আরও কম ঘন ঘন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।

এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রযুক্তিটির ব্যবহার কীভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।

রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমগুলো সংবাদ সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, অনুসন্ধান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপনের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।

সাংবাদিকতায় আগ্রহী কেউ চ্যাটজিপিটিকে ব্যবহার করে সংবাদ লেখার প্রাথমিক কাঠামো শিখতে পারেন। একটি ঘটনার তথ্য কীভাবে সাজাতে হয়, শিরোনাম কীভাবে তৈরি করতে হয়, সংবাদে কোন তথ্য আগে আসবে, সাক্ষাৎকারের জন্য কী ধরনের প্রশ্ন করা যায় এসব বিষয়ে অনুশীলন করা সম্ভব।

এ ছাড়া চ্যাটজিপিটির সাহায্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে প্রাথমিক খসড়া তৈরি, দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, বানান ও বাক্য সংশোধন, তথ্যের তালিকা তৈরি, জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা এবং সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্ন প্রস্তুত করা যায়।

নতুন সাংবাদিকদের জন্য এটি একটি সহায়ক শিক্ষামাধ্যম হতে পারে। কেউ স্থানীয় বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন করতে চাইলে কোন কোন পণ্যের দাম সংগ্রহ করবেন, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কী প্রশ্ন করবেন, সরকারি পরিসংখ্যান কোথায় খুঁজবেন এসব বিষয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।

তবে চ্যাটজিপিটি যে তথ্য দেবে, তা সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। তথ্যের উৎস, তারিখ, পরিসংখ্যান ও বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সাংবাদিকতায় প্রবেশের কয়েকটি পথ তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, নতুনরা স্থানীয় পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির অনুশীলন করতে পারেন। এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, বাজারদর, নাগরিক সমস্যা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করা যায়।

দ্বিতীয়ত, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় সংবাদপোর্টাল, সাময়িকী এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সংবাদ লেখার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, সম্পাদনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপযোগী সংবাদ তৈরি ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণের দক্ষতা কাজে লাগতে পারে।

তৃতীয়ত, নিজস্ব সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা পরিচালনার মাধ্যমে সাংবাদিকতার অনুশীলন করা যায়। তবে সংবাদমাধ্যম পরিচালনা আর স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে চাকরি পাওয়া এক বিষয় নয়। চাকরির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগনীতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।

চতুর্থত, তথ্যনির্ভর ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক হতে পারে। বিপুল পরিমাণ নথি থেকে বিষয়ভিত্তিক তথ্য সাজানো, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে অসংগতি চিহ্নিত করা এবং অনুসন্ধানের সম্ভাব্য দিক নির্ধারণে এটি কাজে লাগানো যায়। কিন্তু নথির সত্যতা, তথ্যের তাৎপর্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাংবাদিকের।

সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো তথ্য সংগ্রহ, সত্যতা যাচাই, জনস্বার্থের বিষয় চিহ্নিত করা এবং নিরপেক্ষভাবে তা উপস্থাপন করা। চ্যাটজিপিটি দিয়ে সুন্দর ভাষায় লেখা তৈরি করা গেলেও বাস্তব ঘটনা প্রত্যক্ষ করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া, সরকারি নথি সংগ্রহ করা কিংবা অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার বিকল্প এটি নয়।

ধরা যাক, কোনো এলাকায় একটি কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের অভিযোগ উঠেছে। চ্যাটজিপিটি এ বিষয়ে সম্ভাব্য প্রশ্ন ও প্রতিবেদন কাঠামো তৈরি করতে পারে। কিন্তু কারখানাটিতে দূষণ হচ্ছে কি না, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন আছে কি না, পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে কী পাওয়া গেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ কতটা সত্য এসব নিশ্চিত করতে সরেজমিন অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য নথি প্রয়োজন।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো কখনো ভুল তথ্য, অস্তিত্বহীন সূত্র কিংবা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দিতে পারে। ভাষা সাবলীল হওয়ায় এসব ভুল সব সময় সহজে ধরা পড়ে না। রয়টার্সের সাংবাদিকতার নীতিমালায়ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি তথ্য ও দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য, গোপন সূত্র এবং অপ্রকাশিত নথির নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংবেদনশীল নথি বা সূত্রের পরিচয় অনুমোদনহীন ব্যবস্থায় দিলে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।

একই সঙ্গে অন্যের লেখা হুবহু ব্যবহার, যাচাই ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি বক্তব্যকে বাস্তব ব্যক্তির নামে প্রকাশ কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি দিয়ে বাস্তব ঘটনার বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে। সংবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় রাখাও প্রয়োজন।

সাংবাদিকতায় প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমে সংবাদ লেখার মৌলিক নিয়ম, সংবাদমূল্য, তথ্য যাচাই, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, সাংবাদিকতার আইন ও নৈতিকতা শিখতে হবে। এরপর স্থানীয় সমস্যা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি, নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের কাছ থেকে সম্পাদনার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

চ্যাটজিপিটিকে শিক্ষক বা সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখতে হবে। প্রতিটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্য, নাম, পদবি, তারিখ, সংখ্যা, উদ্ধৃতি ও সূত্র যাচাই করা অপরিহার্য।

সব মিলিয়ে, চ্যাটজিপিটি সাংবাদিক হওয়ার পথকে সহজ করতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার যোগ্যতা নিজে থেকে তৈরি করে দিতে পারে না। প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে লেখার দক্ষতা বাড়ানো, সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়া শেখা এবং কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব। তবে একজন বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিক হয়ে উঠতে প্রয়োজন অনুসন্ধিৎসা, সততা, সাহস, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা এবং সত্য যাচাইয়ের অভ্যাস। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বও তত বাড়বে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ