চে গেভারা: বিপ্লব, স্বপ্ন ও শোষণমুক্ত সমাজের এক অমর প্রতীক

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ শতকের বিপ্লবী ইতিহাসে কিছু নাম শুধু একটি ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচয় বহন করে না, বরং একটি আদর্শ, একটি স্বপ্ন এবং একটি সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়। আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারা তেমনই এক নাম। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ চে গেভারা আজও বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। তাঁর জীবন ছিল অস্থির সময়ের সঙ্গে লড়াই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে নিবেদিত।
আর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ-রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ়তা। হাঁপানির সমস্যায় ভুগলেও তিনি পরবর্তীকালে দীর্ঘ ভ্রমণ ও কঠিন সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
চে পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৫৩ সালে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যার প্রচলিত পেশাজীবন তাঁকে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারেনি। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, শ্রমিক-কৃষকের বঞ্চনা এবং বিদেশি পুঁজির প্রভাব। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে মোটরসাইকেলে তাঁর লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ তাঁর জীবনদর্শনে বড় পরিবর্তন আনে। ১৯৫২ সালে আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’-এর ভিত্তি তৈরি করে। তিনি বুঝতে পারেন, বিভিন্ন দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার পেছনে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভূমিকা রয়েছে।
মার্কসবাদী চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও গভীর সম্পর্ক তাঁকে ক্রমে বিপ্লবী রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক চেতনায় গভীর ছাপ ফেলে। তিনি উপলব্ধি করেন, লাতিন আমেরিকায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
১৯৫৫ সালে মেক্সিকোতে তাঁর সঙ্গে ফিদেল কাস্ত্রোর পরিচয় হয়। কাস্ত্রো তখন কিউবার স্বৈরশাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চে সেই আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর ‘গ্রানমা’ নামের নৌযানে করে কাস্ত্রো, চে এবং তাঁদের সহযোদ্ধারা মেক্সিকো থেকে কিউবার উদ্দেশে রওনা হন। কিউবার মাটিতে পৌঁছানোর পর শুরু হয় দীর্ঘ গেরিলা সংগ্রাম।
সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ি অঞ্চলে কিউবার বিপ্লবী বাহিনী সংগঠিত হতে থাকে। চে ছিলেন শুধু একজন চিকিৎসক নন; তিনি ধীরে ধীরে একজন দক্ষ গেরিলা কমান্ডার ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কঠিন সামরিক পরিস্থিতি, খাদ্যসংকট, রোগব্যাধি ও সরকারি বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও বিপ্লবীরা তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা কিউবা ছেড়ে পালিয়ে যান। কয়েক দিন পর বিপ্লবীরা হাভানায় প্রবেশ করে। কিউবার বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে চে গেভারা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বিপ্লবের পর তিনি কিউবার রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাশনাল ব্যাংক অব কিউবার প্রেসিডেন্ট এবং শিল্পমন্ত্রী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থান করেও চে নিজেকে কেবল একজন প্রশাসক হিসেবে দেখতে চাননি। তাঁর কাছে বিপ্লব ছিল সমাজের অর্থনৈতিক ও নৈতিক রূপান্তরের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তিনি এমন এক সমাজের কথা বলতেন যেখানে মানুষের শ্রম কেবল ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং সামাজিক কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হবে। তিনি ‘নতুন মানুষ’ বা ‘New Man’-এর ধারণার ওপর গুরুত্ব দেন যে মানুষ কেবল বস্তুগত লাভের জন্য নয়, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক চেতনা থেকে কাজ করবে।
চে গেভারার রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। তিনি মনে করতেন, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর ওপর শক্তিশালী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পুঁজির আধিপত্য শোষণকে দীর্ঘস্থায়ী করে। ফলে কিউবার বিপ্লবকে তিনি কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখেননি; তিনি লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য নিপীড়িত জনগণের মুক্তির বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
এই আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আবার কিউবার সরকারি দায়িত্ব থেকে দূরে নিয়ে যায়। তিনি আফ্রিকার কঙ্গোতে বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে তাঁর অভিযান প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এরপর তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানেও একটি বিপ্লবী গেরিলা আন্দোলন সংগঠনের চেষ্টা করেন।
বলিভিয়ায় চে গেভারার শেষ অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনী সরকারি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ৮ অক্টোবর ১৯৬৭ বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তাঁকে লা ইগুয়েরা এলাকায় আটক করে। পরদিন ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ তাঁকে হত্যা করা হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ হয় তাঁর জীবন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর প্রভাবকে শেষ করতে পারেনি; বরং তাঁকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করে।
চে গেভারার মৃত্যুর পর তাঁর মুখাবয়বের বিখ্যাত ছবি ‘Guerrillero Heroico’ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। শিল্পী আলবার্তো কোরদা ১৯৬০ সালে ছবিটি তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ছবিটি পোস্টার, ব্যানার, দেয়ালচিত্র, টি-শার্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে ছবিটির এমন সম্পর্ক তৈরি হয় যে চে নিজেই একটি প্রতীকে পরিণত হন।
তবে চে গেভারাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রোমান্টিক বিপ্লবী প্রতীক হিসেবে দেখলে তাঁর জটিল রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কিউবার বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তাঁর ভূমিকা, রাজনৈতিক সহিংসতা, বিপ্লবী বিচারব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে নিপীড়িত মানুষের মুক্তি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা এবং সামাজিক ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগী বিপ্লবী হিসেবে দেখেন।
চে গেভারার জীবন তাই একদিকে বিপ্লবী আদর্শের শক্তিশালী প্রতীক, অন্যদিকে ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়। তাঁকে বোঝার জন্য তাঁর সময়, লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা, মার্কিন প্রভাব, কিউবার বাতিস্তা শাসন এবং শীতল যুদ্ধের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
চে গেভারা বিশ্বাস করতেন, অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। মানুষের দুঃখ-কষ্টকে দূর থেকে দেখে কেবল সহানুভূতি প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; অন্যায় সৃষ্টি করে যে কাঠামো, তার পরিবর্তনের প্রশ্নও সামনে আনতে হবে। এই জায়গাতেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের আবেদন আজও অনেক মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের পৃথিবী চে গেভারার সময়ের পৃথিবী নয়। কিন্তু বৈষম্য, দারিদ্র্য, যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, শ্রমের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অসমতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মতো বহু সমস্যা এখনো বিদ্যমান। ফলে চে গেভারার জীবন নিয়ে আলোচনা শুধু অতীত স্মরণ নয়; বরং মানুষের মুক্তি, সামাজিক ন্যায় এবং বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ।
চে গেভারা ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর স্বপ্নকে শেষ করে দিতে পারেনি। তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায় একজন মানুষ কি কেবল নিজের নিরাপদ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবে, নাকি বৃহত্তর মানবসমাজের অন্যায় ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্বও গ্রহণ করবে?
ইতিহাসের বিচার সবসময় একরৈখিক নয়। চে গেভারাকে কেউ বিপ্লবের নায়ক হিসেবে দেখেন, কেউ তাঁর রাজনৈতিক পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেন। কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন তিনি বিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে এমন এক প্রতীক তৈরি করেছিলেন, যার কেন্দ্রে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন।
সেই কারণেই চে গেভারা আজও শুধু একটি নাম নন; তিনি একটি প্রশ্ন, একটি বিতর্ক, একটি স্বপ্ন এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক বহুল পরিচিত প্রতীক।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ