কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানবসভ্যতার জন্য অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও এর অন্ধকার দিক নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। উন্নত এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় কিংবা অপরাধী, সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রীয় কোনো পক্ষের হাতে ভয়ংকরভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে এমন সতর্কতা দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা হলো, ভবিষ্যতে অত্যন্ত সক্ষম এআই ব্যবস্থার সঙ্গে জীবপ্রযুক্তি, সাইবার প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সংযোগ ঘটলে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা প্রতিবেদন-এ বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমর্থনে শতাধিক বিশেষজ্ঞ এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এআই এখন সাইবার হামলা, প্রতারণা, বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি এবং জীবাণু ও রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করছে।
বিশেষজ্ঞদের অন্যতম বড় উদ্বেগ এআই ও জীবপ্রযুক্তির সংযোগ। আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক এআই ব্যবস্থা জীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নির্দেশনা দিতে, গবেষণার বিভিন্ন ধাপের সমস্যা সমাধান করতে এবং প্রযুক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। ফলে কোনো অসৎ ব্যক্তি চাইলে এসব সক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপজ্জনক জৈবিক উপাদান তৈরির পথে সহায়তা পেতে পারে।
একটি গবেষণায় সাম্প্রতিক একটি এআই মডেল ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির প্রোটোকল-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের পরীক্ষায় ৯৪ শতাংশ বিশেষজ্ঞের চেয়ে ভালো ফল করেছে বলে আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে বাস্তবে এ ধরনের সক্ষমতা কতটা প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই কারণেই ২০২৫ সালে একাধিক বড় এআই প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন মডেলে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করে। কারণ পরীক্ষার সময় তারা নিশ্চিতভাবে বাদ দিতে পারেনি যে নতুন মডেলগুলো নবীন ব্যবহারকারীকেও জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে উল্লেখযোগ্য সহায়তা করতে পারে।
এআইয়ের আরেকটি বড় ঝুঁকি সাইবার নিরাপত্তা। বর্তমানে এআই দিয়ে কোড লেখা, দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন সাইবার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে দক্ষ হ্যাকার ছাড়াও তুলনামূলক কম দক্ষ অপরাধীরা অত্যাধুনিক সাইবার হামলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্ট বলছে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তব জগতের সাইবার হামলার ঘটনা সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে এআই এজেন্টগুলো মানুষের সীমিত হস্তক্ষেপে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত বা অপব্যবহার হলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে। আশঙ্কাগুলোর একটি হলো ভবিষ্যতের অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা যদি মানুষের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাজ করতে শুরু করে। জাতিসংঘের এআই-এর উপর স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল এর ২০২৬ সালের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের সক্ষমতা বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া ও সরকারি নীতির চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্যানেলের সহসভাপতি ইয়োশুয়া বেঙ্গিও সতর্ক করেছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এআই নিজে থেকে অথবা মানুষের অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপর্যয়কর ক্ষতি করবে না এমন নিশ্চয়তা বিজ্ঞান এখনো দিতে পারে না।
জাতিসংঘের ওই প্যানেল আরও উল্লেখ করেছে, ভবিষ্যতে ‘এজেন্টিক এআই’ এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে মানুষের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছাড়াই বাস্তব জগতের জটিল কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভুল সিদ্ধান্ত দ্রুত বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের জুনে এমআইটি ও ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষকদের একটি গবেষণায় ৩৭টি দেশের ২৭২ জন এআই বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়। গবেষণায় ২৪টি সম্ভাব্য এআই ঝুঁকির মধ্যে ১৮টিকে বর্তমান উন্নয়নের ধারায় অন্তত ১০ শতাংশ সম্ভাবনাসম্পন্ন সর্বনাশা ক্ষতি বা বিপর্যয়কর ক্ষতির ঝুঁকি হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মূল্যায়ন করেন। এসব ঝুঁকির মধ্যে বিপুল প্রাণহানি বা অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।