৬ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক ভূবৈচিত্র্য দিবস। পৃথিবীর অস্তিত্ব, জীবনের বিকাশ এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রার অন্তরালে যে প্রাকৃতিক ভিত্তি নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, ভূবৈচিত্র্য তার অন্যতম প্রধান উপাদান। শিলা, খনিজ, মাটি, জীবাশ্ম, ভূগর্ভস্থ পানি, নদী-খাত, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রতট, উপকূলীয় ভূমি, গুহা, সমভূমি ও বিচিত্র ভূদৃশ্য সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর ভূবৈচিত্র্যের বিশাল পরিসর। অথচ আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সভ্যতার অস্তিত্বের সঙ্গে এসব উপাদানের গভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভূবৈচিত্র্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ভূবৈচিত্র্যকে কেবল অজৈব প্রকৃতির বৈচিত্র্য হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। এটি মূলত পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং জীবনের বিকাশের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান দলিল। পৃথিবীর যে মাটি আমাদের খাদ্য উৎপাদন করে, যে শিলা থেকে নির্মাণসামগ্রী আসে, যে খনিজ শিল্পসভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে এবং যে ভূগর্ভস্থ স্তর পানির আধার হিসেবে কাজ করে এসবই ভূবৈচিত্র্যের অংশ।
পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। এই দীর্ঘ সময়ের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনে মহাদেশের সৃষ্টি ও পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, পর্বত গঠন, নদীর ক্ষয় ও পলি সঞ্চয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা এবং জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান ভূদৃশ্য গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ একটি পাহাড়, একটি নদী, একটি শিলা কিংবা একটি জীবাশ্মস্থল কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বস্তু নয়; এর প্রতিটির মধ্যে নিহিত রয়েছে পৃথিবীর অতীতের দীর্ঘ ইতিহাস।
এ কারণেই ভূবৈচিত্র্যকে পৃথিবীর একটি প্রাকৃতিক আর্কাইভ বলা যায়। ভূস্তরের গঠন, শিলার প্রকৃতি, জীবাশ্মের উপস্থিতি কিংবা মাটির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অতীতের জলবায়ু, পরিবেশ, জীবের বিবর্তন এবং ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। অতীতকে জানার এই বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
জীববৈচিত্র্য ও ভূবৈচিত্র্য পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোনো ধারণা নয়। বরং জীবনের বৈচিত্র্যের পেছনে ভূপ্রকৃতি, মাটি, পানি ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি অঞ্চলের মাটির রাসায়নিক গঠন, ভূ-উচ্চতা, পানির প্রাপ্যতা, শিলার ধরন ও ভূমির আকৃতি নির্ধারণ করে সেখানে কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মাবে, কোন প্রাণী টিকে থাকবে এবং কী ধরনের বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠবে। অর্থাৎ প্রকৃতির দৃশ্যমান জীবন্ত অংশের পেছনে রয়েছে তার নীরব অজৈব ভিত্তি।
একটি বন কেবল গাছপালার সমষ্টি নয়; সেই বনের অস্তিত্বের সঙ্গে মাটি, পানি, শিলা ও ভূপ্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়; তার গতিপথ, তলদেশ, পলি ও তীরবর্তী ভূমির সঙ্গে একটি বৃহত্তর ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যুক্ত। সুতরাং জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বলতে হলে ভূবৈচিত্র্য সংরক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মানবসভ্যতার বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও প্রকৃতির ভূসম্পদের ওপর মানুষের নির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বসতবাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে সড়ক, সেতু, রেলপথ, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আধুনিক নগরায়ণ প্রায় প্রতিটি অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে শিলা, বালি, মাটি, খনিজ ও পানিসম্পদ যুক্ত। কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি মাটি। মাটির উর্বরতা, গঠন, পানি ধারণক্ষমতা এবং খনিজ উপাদানের ভারসাম্য কৃষির উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। একইভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জলাধারের প্রকৃতি মানুষের পানীয় জল, কৃষি ও শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ যখন প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখনই সংকটের সূত্রপাত ঘটে। পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, নদী-খাল ভরাট, নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলন, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমির দ্রুত পরিবর্তন এবং খনিজ সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত আহরণ ভূবৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। এর ফল শুধু একটি পাহাড় বা একটি নদীর ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে স্থানীয় জলপ্রবাহ, ভূমির স্থিতিশীলতা, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা।
এখানে আমাদের উন্নয়ন দর্শন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন হলো এমন উন্নয়ন, যা বর্তমানের প্রয়োজন পূরণ করবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাকৃতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করবে না। একটি সড়ক নির্মাণের আগে যেমন অর্থনৈতিক ব্যয় বিবেচনা করা হয়, তেমনি সেই সড়ক নির্মাণের ফলে ভূপ্রকৃতি, জলপ্রবাহ, মাটি ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে নগর পরিকল্পনা, শিল্পায়ন, আবাসন কিংবা খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপভূমি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অসংখ্য নদী, চর, হাওর, বিল, জলাভূমি, উপকূল, পাহাড় ও সমতলভূমির সমন্বয়ে দেশের ভূপ্রকৃতি গড়ে উঠেছে। নদীর প্রবাহ, পলি সঞ্চয়, ক্ষয় এবং ভূমির ক্রমাগত পরিবর্তন বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূবৈচিত্র্য সংরক্ষণ মানে শুধু পাহাড় ও শিলা রক্ষা নয়; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, চরাঞ্চলের গঠন, জলাভূমি, উপকূলীয় ভূমি, মাটির গুণাগুণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকেও সুরক্ষা দেওয়া।
নদীভাঙন, ভূমিধস, বন্যা, উপকূলীয় লবণাক্ততা কিংবা ভূমির অবক্ষয়কে শুধু দুর্যোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এসব ঘটনার সঙ্গে ভূপ্রকৃতি, ভূমি ব্যবহার, পানি প্রবাহ ও মানুষের কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাংলাদেশের পরিবেশনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভূবিজ্ঞানের জ্ঞানকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় ভূবৈচিত্র্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন, উপকূলীয় ক্ষয়, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূমিধস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও মাটির বৈশিষ্ট্য না বুঝে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করলে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ফলে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় ভূবৈচিত্র্যকে একটি মৌলিক বিবেচনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
ভূবৈচিত্র্যের অনেক উপাদান একবার ধ্বংস হলে তা মানুষের জীবদ্দশায় পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি একটি শিলা-গঠন, জীবাশ্মস্থল, পাহাড় কিংবা বিশেষ ভূদৃশ্য কয়েক বছরের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডেই হারিয়ে যেতে পারে। তাই ভূবৈচিত্র্য সংরক্ষণ মূলত একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দায়িত্ব। গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভূবিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের ওপর অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।
একই সঙ্গে অবৈধ পাহাড় কাটা, নদী-খাল ভরাট, অপরিকল্পিত বালু ও পাথর উত্তোলন এবং জলাভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু আইন থাকলেই হবে না; তার বাস্তব প্রয়োগ এবং সামাজিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রাকৃতিক ভূসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক ভূবৈচিত্র্য দিবস তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি পৃথিবীকে দেখার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ। প্রকৃতি মানে শুধু গাছপালা, পশুপাখি কিংবা নদী নয়। প্রকৃতির একটি বিশাল অংশ রয়েছে আমাদের চোখের আড়ালে শিলার স্তরে, মাটির গভীরে, ভূগর্ভস্থ পানির আধারে, পাহাড়ের গঠনে, নদীর তলদেশে এবং কোটি বছরের জীবাশ্মের মধ্যে।
পৃথিবীর এই নীরব সম্পদই দৃশ্যমান জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। তাই ভূবৈচিত্র্য ধ্বংস করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব নয়; প্রাকৃতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত প্রকৃতিকে শুধু ব্যবহার করব না, তাকে বুঝব; শুধু সম্পদ হিসেবে দেখব না, তার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক মূল্য উপলব্ধি করব; উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ভিত্তি ধ্বংস না করে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পথ নির্মাণ করব।
কারণ ভূবৈচিত্র্য কোনো মৃত বা নিষ্ক্রিয় সম্পদ নয়। এটি পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত দলিল, জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি, মানবসভ্যতার নীরব অবলম্বন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে তাই জীবনের দৃশ্যমান বৈচিত্র্যের পাশাপাশি তার অদৃশ্য ও নীরব ভূতাত্ত্বিক ভিত্তিকেও সমান গুরুত্বে রক্ষা করতে হবে।