আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আজ

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস: কৃষি, পরিবার ও অর্থনীতির নেপথ্যের কারিগর নারীরা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির অগ্রগতি, পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে যেসব মানুষের শ্রম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে গ্রামীণ নারীরা অন্যতম। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁদের দিন শুরু হয়, যাঁদের হাতের স্পর্শে সবজির ক্ষেত সবুজ হয়ে ওঠে, যাঁদের শ্রমে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার সচল থাকে, যাঁদের যত্নে পরিবার বেঁচে থাকার শক্তি পায় সেই নারীদের অবদান অনেক সময়ই থেকে যায় স্বীকৃতির আড়ালে। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণ, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য প্রস্তুত, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সেবা সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান অপরিসীম। অথচ এই নারীদের একটি বড় অংশ এখনো অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চনা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন।
১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। দিনটি শুধু গ্রামীণ নারীদের অবদান স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; বরং তাঁদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নতুন করে সামনে আনার দিন। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ নারীদের বাদ দিয়ে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা কিংবা টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নের কোনো লক্ষ্যই পূর্ণতা পেতে পারে না।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৮ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। গ্রামীণ নারীদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের সামনে থাকা বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা দূর করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীর শ্রমের ব্যাপ্তি অনেক বিস্তৃত। বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি চাষ, ধান শুকানো, ফসল বাছাই, বীজ সংরক্ষণ, গবাদিপশু পালন, দুধ সংগ্রহ, হাঁস-মুরগি লালন-পালন কিংবা মাছ চাষের বিভিন্ন কাজে নারীরা যুক্ত থাকেন। অনেক নারী সরাসরি জমিতে কাজ করেন, আবার অনেকে ফসল ঘরে তোলা ও পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণের দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু এসব কাজের বড় অংশই পারিবারিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে নারীর শ্রমের আর্থিক মূল্য যথাযথভাবে নির্ধারিত হয় না। একজন নারী দিনের পর দিন কৃষিকাজে শ্রম দিলেও জমির মালিকানা, কৃষিঋণ গ্রহণ কিংবা উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত থাকতে পারে।
এখানেই গ্রামীণ নারীর শ্রম ও স্বীকৃতির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান নয়, অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমের গুরুত্বও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের শ্রম প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি শস্য সংরক্ষণ, বীজের মান রক্ষা, সবজি উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে তাঁরা পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখেন।
অনেক গ্রামীণ পরিবারে নারীর উদ্যোগেই বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ হয়। হাঁস-মুরগি পালন কিংবা গরু-ছাগল লালন-পালন থেকে পাওয়া অর্থ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সাহায্য করে। সংকটের সময়ে এসব উদ্যোগ পরিবারের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবেও কাজ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, নদীভাঙন কিংবা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি ও জীবিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এসব পরিস্থিতিতে ফসলের ধরন পরিবর্তন, বীজ সংরক্ষণ, বিকল্প খাদ্য উৎপাদন এবং সীমিত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নারীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হলে প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সেচসুবিধা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তাঁদের শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, কৃষি উদ্যোক্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
গ্রামীণ নারীর উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর সীমিত নিয়ন্ত্রণ। অনেক নারী পরিবারের আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জমি, বাড়ি কিংবা অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদের মালিকানা তাঁদের হাতে থাকে না। ফলে ব্যাংকঋণ, কৃষিঋণ কিংবা উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণে তাঁরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন।
কোনো নারী ক্ষুদ্র খামার গড়ে তুলতে চাইলে তাঁর প্রয়োজন মূলধন, প্রশিক্ষণ, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা। কিন্তু এসব সুযোগের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যায়। আবার ক্ষুদ্রঋণ পেলেও যথাযথ বাজারব্যবস্থা ও লাভজনক ব্যবসার সুযোগ না থাকলে ঋণের অর্থ আয় বৃদ্ধিতে কার্যকর হয় না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নারীবান্ধব ঋণব্যবস্থা, সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং পণ্য বিপণনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্পের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। নিজের শ্রমে অর্জিত আয় ব্যবহারের অধিকার এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলে একজন নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সরকারি সেবা গ্রহণ, আর্থিক হিসাব রাখা কিংবা প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ, ঝরে পড়া এবং পারিবারিক দায়িত্বের চাপ শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের অভাব অনেক নারীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন জটিলতা, অপুষ্টি এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক পরিশ্রম তাঁদের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করে।
এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি এবং সামাজিক বৈষম্যও তাঁদের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক নারী সামাজিক মর্যাদা হারানোর আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে চান না। আবার আইনি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় তাঁরা ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হন।
এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে নারী সহায়তা কেন্দ্র, আইনি পরামর্শ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি গ্রামীণ নারীর জীবন ও জীবিকার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মুঠোফোনের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের বাজারদর জানা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া, কৃষিবিষয়ক পরামর্শ গ্রহণ এবং অনলাইনে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এই সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। অনেক গ্রামীণ নারী স্মার্টফোন ব্যবহার, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না। কোথাও পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুমতি ছাড়া তাঁদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও সীমিত থাকে।
এই ব্যবধান কমাতে নারীদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং অনলাইন বিপণন শেখানো যেতে পারে। এতে গ্রামীণ নারীরা স্থানীয় বাজারের বাইরে বৃহত্তর ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারবেন।
প্রযুক্তির সঙ্গে নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে নারীদের ব্যক্তিগত আয় বাড়বে এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষ ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হন। লবণাক্ততা বাড়লে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হয়। বন্যা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবারের খাদ্য, আয় ও নিরাপত্তা বিপন্ন হয়।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের দায়িত্ব নারীদের ওপর পড়ে। দুর্যোগের সময় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনার বাড়তি চাপও তাঁদের বহন করতে হয়। ফলে একই দুর্যোগ নারী ও পুরুষের জীবনে ভিন্ন মাত্রার প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। আশ্রয়কেন্দ্রে নারীবান্ধব শৌচাগার, নিরাপদ পানি, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বিকল্প জীবিকা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে শুধু দিবস পালন কিংবা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং জবাবদিহি। প্রথমত, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রণোদনা এবং কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ তাঁদের জন্য সহজ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নারীর সম্পত্তির অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরাধিকারসহ প্রচলিত আইনে স্বীকৃত অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তবে অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
তৃতীয়ত, গ্রামীণ নারীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুযত্নের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে নারীরা পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি আয়বর্ধক কাজে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।
চতুর্থত, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। তাঁদের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না নিয়ে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হলে তা অনেক সময় কার্যকর হয় না। তাই কৃষি, পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ, বাজারব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পঞ্চমত, নারীর অবৈতনিক শ্রমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে। পরিবারের কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে নারী-পুরুষের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নারীর কর্মজীবন, শিক্ষা ও বিশ্রামের সুযোগ বাড়বে।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে গ্রামীণ নারীকে পিছিয়ে রেখে কোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁরা শুধু কৃষি উৎপাদনের সহায়ক শক্তি নন; তাঁরা খাদ্যনিরাপত্তার রক্ষক, পরিবারের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
একজন গ্রামীণ নারী যখন শিক্ষিত হন, তখন তাঁর পাশাপাশি পরিবারও উপকৃত হয়। তিনি যখন নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ে। তিনি যখন কৃষিপ্রযুক্তি ও বাজারের সুযোগ পান, তখন উৎপাদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর তিনি যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার পান, তখন উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
তাই ১৫ অক্টোবরের তাৎপর্য শুধু গ্রামীণ নারীদের অবদান স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন আমাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে, অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
গ্রামীণ নারীদের এগিয়ে নেওয়া কোনো দয়া কিংবা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং সামাজিক অগ্রগতি আরও শক্তিশালী হবে। যে দেশের গ্রামীণ নারী আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী ও অধিকারসচেতন, সেই দেশের উন্নয়নের ভিত্তিও হয় অধিকতর সুদৃঢ়।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক গ্রামীণ নারীর শ্রম আর অবহেলার আড়ালে থাকবে না, তাঁদের স্বপ্ন থেমে থাকবে না বৈষম্যের দেয়ালে। সমান অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে এমন এক সমাজ, যেখানে গ্রামীণ নারী শুধু উন্নয়নের অংশীদার নন, বরং উন্নয়নের নেতৃত্বেও থাকবেন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ