১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন

আজাদ হিন্দ সরকার: স্বাধীনতা সংগ্রামে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করার একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন এবং জাপানের সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতায় সিঙ্গাপুরে এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠা করা।

আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব। সুভাষচন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গে কৌশলগত মতপার্থক্যের পর তিনি সশস্ত্র সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ বেছে নেন। ইউরোপে অবস্থানকালে ব্রিটিশবিরোধী শক্তির সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে সামরিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান ও সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সরকারটি নিজেকে স্বাধীন ভারতের বৈধ অস্থায়ী সরকার হিসেবে ঘোষণা করে। এর নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, মুদ্রা, বিচারব্যবস্থা ও দণ্ডবিধি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল। জাপানসহ অক্ষশক্তির কয়েকটি দেশ সরকারটিকে স্বীকৃতি দেয়। তবে ব্রিটিশ সরকার এবং মিত্রশক্তি একে স্বাধীন ভারতের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এ কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর বৈধতা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক ছিল।
১৯৪৩ সালের শেষ দিকে জাপান আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক দায়িত্ব আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। দ্বীপ দুটির নামকরণ করা হয় যথাক্রমে ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’। তবে সেখানে জাপানি সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রভাব বজায় ছিল এবং আজাদ হিন্দ সরকারের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ছিল সীমিত। ফলে সরকারটির অস্তিত্ব ও কার্যক্রমের সঙ্গে জাপানের সামরিক কৌশল গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে।

আজাদ হিন্দ সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)। এই বাহিনীর সূচনা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্দি ভারতীয় সৈন্যদের মধ্য থেকে, পরে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এটি নতুন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে। নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’ ছিল বাহিনীটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।

১৯৪৪ সালে জাপানি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ইম্ফল ও কোহিমাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিযানে বাহিনীটি মণিপুরের মৈরাং পর্যন্ত পৌঁছায় এবং সেখানে আজাদ হিন্দের পতাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু মিত্রবাহিনীর বিমানশক্তি, রসদের ঘাটতি, প্রতিকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ সরবরাহপথের কারণে জাপানি বাহিনী এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। সামরিক দিক থেকে এই অভিযান সফল হয়নি; বরং জাপানের পরাজয় ও পশ্চাদপসরণের সঙ্গে সঙ্গে আজাদ হিন্দ সরকারের কার্যকর ক্ষমতাও ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পর আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক কার্যক্রম ভেঙে

 

পড়ে। সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যুসংবাদ ১৯৪৫ সালের আগস্টে ছড়িয়ে পড়ে, যদিও তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আজাদ হিন্দ সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ কার্যত শেষ হয়ে যায়।
তবে আজাদ হিন্দ সরকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল তার সামরিক সাফল্য বা ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের পর আইএনএর সদস্যদের বিরুদ্ধে দিল্লির লালকেল্লায় বিচার শুরু হলে ভারতজুড়ে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। যাঁদের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল, তাঁদের অনেকেই সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীনতার সংগ্রামী হিসেবে সম্মানিত হন। তাঁদের বিচারের প্রতিবাদে ছাত্র, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৪৬ সালে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহসহ ব্রিটিশ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে অসন্তোষের ঘটনাগুলোও ঔপনিবেশিক শাসনের স্থিতিশীলতা নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

আজাদ হিন্দ সরকার ভারতের স্বাধীনতা এককভাবে অর্জন করেছিল এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। ভারতের স্বাধীনতা ছিল দীর্ঘ গণআন্দোলন, বিপ্লবী তৎপরতা, রাজনৈতিক দর-কষাকষি, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সম্মিলিত ফল। তবু সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ সরকার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। এর উত্তরাধিকার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসে আজও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ