অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বয়লার মুরগিতে: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি?  

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের আশঙ্কা, গবেষণায় মিলছে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ

বাজারে তুলনামূলক কম দামে সহজলভ্য হওয়ায় দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস বয়লার মুরগি। দ্রুত ওজন বাড়ানো, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং খামারে মৃত্যুহার কমাতে অনেক ক্ষেত্রে মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। তবে রোগ নিরাময়ের প্রয়োজনীয় ব্যবহারের সঙ্গে নির্বিচার বা অতিরিক্ত ব্যবহারের পার্থক্য রয়েছে। গবেষণা বলছে, প্রয়োজনের বাইরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে মুরগির মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকার পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ বা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের বয়লার মুরগি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত ২৭৩টি মুরগির মাংসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এসব নমুনার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে অন্তত একটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার ওপরে ছিল। গবেষণাটিতে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের মোট ৫৫৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং একই পদ্ধতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমার সঙ্গে ফলাফল তুলনা করা হয়।বাংলাদেশে বয়লার মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নিয়ে ২০২৩ সালের আরেক গবেষণায় দেশের পাঁচটি বিভাগের বিভিন্ন খামার, বাজার ও সুপারমার্কেট থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, ডক্সিসাইক্লিন, সালফাডায়াজিন ও ক্লোরামফেনিকলের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। গবেষণায় অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও ডক্সিসাইক্লিনের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের মাত্রা নির্ধারিত সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমার নিচে ছিল।
ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় পরিচালিত আরেক গবেষণায় ২৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় বিভিন্ন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। বয়লার মাংসের ৩৫ শতাংশ নমুনায় অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হয়েছিল। গবেষণায় পরীক্ষা করা মাংসের ২ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় অবশিষ্টাংশ সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমার ওপরে ছিল।
স্বাস্থ্যঝুঁকির সবচেয়ে বড় দিকটি শুধু মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ নয়; বরং অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ তৈরি হওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীতে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া খাদ্যশৃঙ্খল, পরিবেশ কিংবা প্রাণী ও মানুষের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কোনো কোনো সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধ কম কার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, প্রাণীতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির অন্যতম কারণ। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, প্রাণীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী, সঠিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ১৪০টি বাণিজ্যিক মুরগির খামার নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় ১৩৭টি খামারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত খামারগুলোর ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে কোনো না কোনো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার করা হয়েছিল। বয়লার খামারগুলোতে কোলিস্টিন, ডক্সিসাইক্লিন ও নিউমাইসিন ব্যবহারের হার তুলনামূলক বেশি ছিল।
আরেক গবেষণায় বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বয়লার ও লেয়ার খামারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের সঙ্গে মুরগি ও খামারের পরিবেশে থাকা ইশেরিশিয়া কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধের সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণাটির উদ্দেশ্যই ছিল খামারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিরোধী জীবাণুর সম্পর্ক বোঝা।
মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে জবাই করে বাজারজাত করা হলে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত ‘প্রত্যাহারকাল’ বা ওষুধ বন্ধ করার পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও উৎপাদন পর্যায়ের খামার থেকে বাজার বা জবাইয়ের পর্যায়ে যাওয়ার সময় অবশিষ্টাংশের মাত্রা কমে আসার প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষকেরা বিশেষ করে প্রত্যাহারকাল সম্পর্কে খামারি ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা এবং অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু খামারিকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। পশুচিকিৎসক, ওষুধ বিক্রেতা, খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, খামারি, মুরগি ব্যবসায়ী এবং সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির অন্যতম চালিকা শক্তি। একই সঙ্গে প্রাণিজ খাদ্যে অবশিষ্টাংশ এবং খামারের বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সুস্থ প্রাণীতে নিয়মিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ বা দ্রুত বৃদ্ধির চর্চা বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হলে চিকিৎসাগত কারণেই ব্যবহার করতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সমস্যার সমাধান অ্যান্টিবায়োটিক পুরোপুরি বন্ধ করা নয়। অসুস্থ মুরগির যথাযথ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। তবে রোগ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ দেওয়া, মানুষের ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক অপ্রয়োজনে ব্যবহার, খাবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ওষুধ মেশানো এবং নির্ধারিত প্রত্যাহারকাল না মেনে মুরগি বাজারজাত করার মতো চর্চা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে খামারে পরিচ্ছন্নতা, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানি, সুষম খাবার, টিকা এবং যথাযথ খামার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে রোগের চাপ কমানো সম্ভব। এতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনও কমতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারের প্রতিটি বয়লার মুরগি অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে ক্ষতিকর, অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে উপেক্ষা করা কোনভাবেই  নিরাপদ নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণায় মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি এবং কিছু নমুনায় সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা অতিক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির বৈশ্বিক ঝুঁকিও রয়েছে।
তাই ভোক্তার নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, খামার পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ, পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার বন্ধ, প্রত্যাহারকাল কঠোরভাবে মানা এবং বাজার পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি এই ব্যবস্থাগুলো জোরদার করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ