তিনি আটপৌরে বাঙালির জীবনে কোনও আদর্শপুরুষ নন। তিনি বাঙালির কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত এক পুরুষ। স্বাধীনোত্তর দেশে চিরকাল স্বপ্নভঙ্গে অভ্যস্ত বাঙালির যাবতীয় ইচ্ছাপূরণের জীবন্ত প্রতীক। তিনি উত্তমকুমার। তাঁর নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে আজও আমরা আনমনা হই। কেমন ছিল সেই স্বপ্নপুরুষের যাত্রাপথের শুরুর দিনগুলি, কেমনই বা ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার নানা বাঁক বা বাঁকবদল— দেখল
দেশ ব্রিটিশমুক্ত হল, তিনি ‘মুক্তি’ পেলেন না: সবে দেড়-দু’বছর হয়েছে কলেজের পড়া ছেড়ে সাধারণ একটা চাকরিতে ঢুকেছেন উত্তমকুমার। অফিস করে সন্ধেবেলায় ঢুঁ মারেন থিয়েটারে, কখনও সিনেমা দেখতে চৌরঙ্গীপাড়ার সাহেবি হলে। পাশাপাশি, গানবাজনাও চলছে। চলছে ক্লাবের নাটকে অভিনয়ও। হলিউডের তারকাদের অভিনয় দেখতে দেখতেই মাথায় চাপল সিনেমায় অভিনয়ের পোকা। আচমকা সুযোগও এল একদিন। তবে যাত্রার শুরুটা মোটেই ভাল হল না উত্তমকুমারের। শুরুতেই যে ধাক্কা! ১৯৪৭ সালে দেশ ব্রিটিশমুক্ত হল, কিন্তু তিনি ‘মুক্তি’ পেলেন না। প্রথম ছবি হিন্দি, ‘মায়াডোর’। ঘনিষ্ঠ পড়শি গণেশদা (বন্দ্যোপাধ্যায়) রেডিয়োয় নাটক করতেন। প্রযোজক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে গণেশদা একটা রোলে সুযোগ পান ওই ছবিতে। সেটা শুনে উত্তমও নাছোড়! গণেশদার হাতেপায়ে ধরে দৈনিক পাঁচ সিকে পারিশ্রমিকে সেই ছবিতে এক্সট্রা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান উত্তমও। বিয়ে করতে আসা এক বরের চরিত্রে। ছোট্ট রোল, তবে অজ্ঞাত কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি। হতাশ হলেও হাল ছাড়লেন না উত্তম।
অবশেষে মুক্তি, সঙ্গী ব্যর্থতা এবং বঞ্চনাও: ১৯৪৮-এ প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দৃষ্টিদান’, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাসের চিত্রনাট্য, পরিচালনায় নীতিন বসু। নায়ক নয়, পার্শ্বচরিত্র পেলেন উত্তম। নায়ক অসিতবরণের ছোটবেলার চরিত্র। বক্সঅফিসে ফ্লপ করল ছবি। সেই সঙ্গে নানা বঞ্চনারও শিকার হলেন উত্তম। ছবিতে তিনি থাকলেও ক্রেডিট টাইটেল, ছবির প্রচারপুস্তিকা বা বিজ্ঞাপনে কোথাও তাঁর নাম বেরোল না। অথচ, নায়িকা সুনন্দাদেবীর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় যিনি করেছিলেন, সেই কেতকী দত্তের (পরবর্তী কালে নাট্যজগতে বিখ্যাত হন) নাম ছিল সর্বত্র। একই সঙ্গে, অন্য বঞ্চনাও জুটল। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য ২৭ টাকা পারিশ্রমিক ধার্য হয়েছিল তাঁর। কিন্তু যিনি ছবিতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তাঁকে কমিশন বাবদ অর্ধেক টাকা দিতে হয়েছিল। ফলে উত্তম হাতে পেলেন মাত্র সাড়ে তেরো টাকা। এই সবকিছু নিয়ে পরে আত্মজীবনীতে লিখেছেন উত্তম।
‘দৃষ্টিদান’-এর জেরে ‘দৃষ্টির বাইরে’ প্রেমিকা: ছবিতে অভিনয়ের আগেই পাড়ার গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের মেয়ে গৌরীর সঙ্গে উত্তমের সম্পর্ক তৈরি হয়। উত্তমের জেঠতুতো বোনের বান্ধবী ছিলেন গৌরী, সেই সূত্রে প্রায়ই উত্তমদের বাড়ি আসতেন তিনি। সিনেমায় আসার আগে মায়ের পাশাপাশি গৌরীরও অনুমতি চেয়েছিলেন উত্তম। গৌরী সানন্দে রাজি হয়ে যান। গন্ডগোল বাধে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মুক্তির পরে। ঠাকুরমার সঙ্গে ছবিটি দেখতে গিয়েছেন গৌরী। ঠাকুরমা মজা করে তাঁকে প্রশ্ন করেন, পর্দায় কাকে তাঁর পছন্দ। গৌরী সরল মনে উত্তমকে দেখিয়ে দেন। ঠাকুরমা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, শেষে ওই রোগা ছেলেটাকেই তার পছন্দ? তখন কিছুটা সাহস করেই সত্যিটা ঠাকুরমাকে বলে ফেলেন গৌরী। ব্যস! সব শুনে তার পর থেকে বাড়ি থেকে গৌরীর বেরোনোই বন্ধ করে দেন বাড়ির লোকজন। কিছুদিন উত্তম-গৌরীর সাক্ষাতও বন্ধ। পরে উত্তম নিজেই গৌরীর বাবার কাছে তাঁর মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এই ঘটনার কথাও আত্মজীবনীতে উত্তম লিখে গিয়েছেন।
‘বসু পরিবার’ থেকে বাঙালি পরিবারে: ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত ছ’-সাতটা ছবি মোটেই দর্শকদাক্ষিণ্য পায়নি, আর নবাগত বলে সেই ব্যর্থতার দায় অনেকটা তাঁর উপরেই পড়েছিল। মোড় ঘুরল নির্মল দে-র ‘বসু পরিবার’ ছবিতে, বড়ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ মিলল। পারিবারিক টানাপড়েনের গল্প নিয়ে এই ছবি মুক্তি পেল ১৯৫২-তে, তাঁর অভিনয়ও এই প্রথম প্রশংসিত হল। একই সঙ্গে সিনেমারসিক বাঙালি পরিবারের অন্দরের আলোচনাতেও উঠে এলেন উত্তম, সেই প্রথম।
মালা নারাজ, তৈরি হল চির-রোম্যান্টিক জুটি: আস্থা রেখেছিলেন নির্মল দে। মান রেখেছিলেন উত্তম। ‘বসু পরিবার’-এর সাফল্য দেখে তাই পরের ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ (১৯৫৩) একেবারে নায়ক হিসেবেই নির্মল বেছে নিলেন উত্তমকে। যদিও এই ছবির সাফল্যের মূলে ছিল তুলসী চক্রবর্তী ও মলিনা দেবীর রাগ-অনুরাগের অসামান্য রসায়ন ও মেসবাড়ির দুরন্ত মজা, কিন্তু এই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দিয়েই শুরু হল উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের রোম্যান্টিক জুটির যাত্রা। সেটাও হয়তো হত না, যদি মালা সিংহ নায়িকার চরিত্র করতে রাজি হতেন। ভবানীপুরের বাসিন্দা মালার তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করে নামডাক হয়েছে। পরিচালক তাঁকেই প্রথমে নায়িকার চরিত্রটি করার জন্য প্রস্তাব দেন। শোনা যায়, সিনেমায় অভিনয়ে নাকি আপত্তি ছিল মালার পরিবারের। তবে অন্য সূত্রে শোনা যায়, ছবিতে ইতিমধ্যেই অভিনয় করছিলেন মালা। ডেট দিতে না পারায় নির্মল দে-কে ফিরিয়ে দিতে হয়। অগত্যা সুচিত্রাকে নেন পরিচালক। ওই বছরেই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মুক্তির ১৩ দিন আগে মুক্তি পায় সুচিত্রার প্রথম ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’।
সফল ‘অগ্নিপরীক্ষা’, উত্তম-সুচিত্রা জুটি সুপারহিট: এর আগে পাঁচটা ছবিতে জুটি বাঁধা হয়ে গিয়েছে। প্রায় সবগুলিই সফল। বিভূতি লাহার পরিচালনায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’ (১৯৫৪) উত্তম-সুচিত্রার ষষ্ঠ ছবি। দু’জনেরই কেরিয়ারে অভাবনীয় সাফল্য এনেছিল ছবিটি। এ ছবির প্রযোজকসংস্থার কাছে প্রথম পছন্দ ছিল বিকাশ রায় ও অনুভা গুপ্ত। শুনেই বেঁকে বসেন পরিচালক, তিনি উত্তম-সুচিত্রাকেই নেবেন। অগত্যা রাজি হলেন এমপি প্রোডাকশনের কর্ণধার মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়। আপাদমস্তক রোম্যান্টিক এই ছবিটিতে নায়ক-নায়িকার সংলাপ এই জুটির আগের ছবির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বলেই রসিকেরা মনে করেন। পাশাপাশি, এই ছবিতে খোদ পরিচালক বিভূতি লাহা ও বিজয় ঘোষের ক্যামেরার কাজ খুবই প্রশংসিত হয়েছিল। ‘অগ্নিপরীক্ষা’র জনপ্রিয়তা দেখে কয়েক বছর পরে তেলুগু ও তামিল ছবি হয়েছিল ‘মঙ্গল্যা বলাম’ ও ‘মঞ্জল মহিমাই’ নামে। ১৯৬৭ সালে উত্তমকুমার নিজের প্রযোজনায় হিন্দিতে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ করেন ‘ছোটী সী মুলাকাত’ নামে। যদিও সেই ছবি চূড়ান্ত ব্যর্থ হয় এবং আর্থিক সমস্যায় পড়েন উত্তম।
নায়ক-গায়ক জুটির সফল সূচনা: ১৯৫৫ সাল। বাংলা সিনেমায় বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র হাত ধরে। ও দিকে, উত্তমের খ্যাতিও ক্রমশ বাড়ছে। আরও জনপ্রিয় উত্তম-সুচিত্রা জুটি। সেই বছরেই মুক্তি পেল সুধীর মুখোপাধ্যায়ের ‘শাপমোচন’। প্রিয় জুটির পাশাপাশি গল্পে তো বটেই, গানে ও সুরেও দর্শকমন ভিজিয়ে দিয়েছিল এই ছবি। সুর ও কণ্ঠের সেই কারিগর ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘শোনো, বন্ধু শোনো’, ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে’— নায়ক উত্তমের লিপে হেমন্তের হৃদয় নিংড়ানো সুরেলা কণ্ঠের এই সব গান সেদিন জন্ম দিয়েছিল উত্তম-হেমন্ত নামক প্রায় কিংবদন্তি এক জুটিরও। শোনা যায়, পরিচালক প্রথমে সঙ্গীত পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন শচীন দেববর্মণকে। সময় দিতে পারেননি শচীন। ফলে বম্বে থেকে ডাক পড়ে হেমন্তের। তৈরি হল ইতিহাস। যদিও এর আগে ‘সহযাত্রী’ ছবিতে উত্তমের লিপে গান করেন হেমন্ত। কিন্তু সেই ছবি ফ্লপ হয়, প্রিন্টও পাওয়া যায় না।
রীতি ভেঙে ইতিহাস ‘চন্দ্রনাথ’ ও পিতাপুত্র জুটির: একে তো মেট্রোর ‘শুধু ইংরেজি সিনেমা’ দেখানোর রীতি ভেঙে দিল কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘চন্দ্রনাথ’। শোনা যায়, ছেলের ছবির রিল ঘোরাতে ঘোরাতে পর্দায় ছেলের অভিনয়ে মুগ্ধ হতেন তাঁর বাবা সাতকড়ি। তাঁর চোখে কি আনন্দাশ্রু নামত? এই ছেলেকেই তো দশ বছর আগে ইন্ডাস্ট্রির লোকজন ‘তোমার কিছু হবে না’, ‘ফ্লপ মাস্টার’ বলে কটাক্ষ করেছিল। সেই ছেলেরই ছবি চলছে সাহেবপাড়ার হলে, তাঁরই হাতে! পিতা-পুত্র সে দিন ইতিহাস রচনা করলেন। জনপ্রিয়তার এমনই অমোঘ টান যে, শহর ও মফস্সলের তথাকথিত বাঙালি মধ্যবিত্ত ভাবনায় গড়ে তোলা, ইচ্ছাপূরণের সেই স্বপ্নপুরুষ উত্তমকে জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল চৌরঙ্গীপাড়া। ওই বছরেই লাইটহাউসে মুক্তি পায় ‘পথে হল দেরী’, তার আগের বছর নিউ এম্পায়ারে মুক্তি পায় ‘চিরকুমার সভা’। ওই দুটি হলেও এর আগে শুধু ইংরেজি ছবিই চলত।
‘সপ্তপদী’: বিরহ মানতে পারেননি ‘রিনা ব্রাউন’: ১৯৬১ সালে এল অজয় কর পরিচালিত উত্তম-সুচিত্রা জুটির ‘সপ্তপদী’। রাতারাতি সুপারহিট! উত্তম-সুচিত্রাকে যে এমন দুঃসাহসিক ও বন্ধনহীন প্রেমের গল্পে এর আগে দেখেনি বাঙালি দর্শক! এই জুটি তো বটেই, বাংলা সিনেমাতেও ভালবাসার গল্প বলার এমন আধুনিক নির্মাণ ও বয়ান এই প্রথম। রসিকজনেরা বলে থাকেন, এটাই নাকি এই জুটির সেরা ছবি। বাঙালি যে এ ভাবে দুই ভিন্ধর্মের প্রেম এত আদর করে কাছে টেনে নেবে, তা প্রথমে বোঝা যায়নি। শোনা যায়, ছবির শেষটা ছিল এ রকম, চার্চের ফাদাররূপী কৃষ্ণেন্দু (উত্তম) কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত। কিন্তু এই ক্লাইম্যাক্স পছন্দ হয়নি রিনারূপী সুচিত্রার। পরিচালককে তিনি জানান, এমনটা হলে দর্শক নেবে না। এর পরে দৃশ্য বদলের প্রস্তাব যায় লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তিনিও রাজি হননি। পরে উত্তমের ভাই তরুণকুমার তাঁকে গিয়ে ধীরেসুস্থে বোঝান। নরম হন লেখক। রিনা-কৃষ্ণেন্দুর মিলনেই শেষ হয় ছবি। তবে সবটাই নাকি হয়েছিল উত্তমের অগোচরে।
উত্তমে ঢাকা পড়বে তাঁর অভিনয়! গুজব ওড়ান সুচিত্রাই: ‘সপ্তপদী’র প্রস্তুতির শুরুতে অন্য ধাক্কা! তখন উত্তম-সুচিত্রা জুটি মধ্যগগনে। তাঁদের এই শিখরছোঁয়া সাফল্য ইন্ডাস্ট্রির অনেকেরই ঈর্ষার কারণ ছিল। শোনা যায়, এই জুটি আবার সফল হবে, এটা মানতে না পেরে ইন্ডাস্ট্রিরই কেউ কেউ গুজব ছড়িয়ে জুটির ভাবমূর্তিতে আঘাত করতে শুরু করে। এমনকি, খোদ সুচিত্রার কাছে গোপনে লোক পাঠানো হয় ‘সপ্তপদী’তে অভিনয় না করার জন্য প্রস্তাব দিতে। তাঁকে এ-ও বলা হয়েছিল, এই ছবিতে নায়কের চরিত্রের সামনে ঢাকা পড়ে যাবে নায়িকার চরিত্র। পাশাপাশি, এমন অজুহাতও দেখানো হয়, গল্পে এক ব্রাহ্মণ নায়কের সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রিনা ব্রাউনের প্রেম কিছুতেই গ্রহণ করবে না বাঙালি দর্শক। কিন্তু সুচিত্রা নাকি ওই সতর্কবাণীতে কান দেননি। আর গল্পের দুই ভিন্ধর্মের প্রেমগাথায় সেদিন মজেছিল বাঙালি, আজও তা-ই।
প্রথম হৃদ্রোগে আক্রান্ত সত্যজিতের সেটে: বলিউডে ‘ছোটী সী মুলাকাত’-এর কাজেই প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকায় সত্যজিতের ‘চিড়িয়াখানা’ (১৯৬৭) ছবির জন্য সময় দিতে পারছিলেন না উত্তম। ‘নায়ক’ করার সময়েই ‘চিড়িয়াখানা’র প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়। শোনা যায়, ছবিটি পরিচালনা করার কথা প্রথমে ভেবেছিলেন সত্যজিতের সহকারী পরিচালক রমেশ সেন (পুনু সেন), দুলাল দত্ত, অমিয় সান্যালেরা মিলে। চিত্রনাট্য লিখে দেবেন, বলেছিলেন সত্যজিৎ। ব্যোমকেশ করবেন উত্তম। কম পারিশ্রমিকে তাঁকে রাজিও করে ফেলেছিলেন রমেশ সেন। শেষপর্যন্ত প্রযোজকের শর্তে সত্যজিৎকেই পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু সবকিছু ঠিক হওয়ার পরে একের পর এক ডেট দিয়েও কলকাতা ফিরতে পারছিলেন না উত্তম। সত্যজিৎ নাকি রেগেও গিয়েছিলেন। শেষে যেদিন এলেন, শুটিং সেটেই উত্তম হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলেন।
সুর করলেও গান করতে না পারার আফসোস: ছবিতে নিজে গান করতে চেয়েছিলেন উত্তমকুমার? তাঁর ঘনিষ্ঠেরা অনেকেই বলেছেন, উত্তমের গানের গলা খুবই মিষ্টি ছিল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছেন, অথচ ভাল গাইবেন না, সেটা কি হয়! তাই হয়তো সিনেমাতেও গাওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল তাঁর। অন্তত, তেমনই ইঙ্গিত মেলে তাঁর নিজের লেখায়। তাঁর লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ বইয়ে এক জায়গায় তিনি এটা নিয়ে আফসোসও করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি সিনেমায় এলেও তাঁকে দিয়ে যে গান গাওয়ানো হবে না কোনওদিন, তা কি তিনি ভেবেছিলেন? তার বদলে অন্যের গাওয়া গান তাঁর লিপে শুনবে দর্শক! বোঝাই যায় তাঁর যন্ত্রণা। তবে মাঝেমধ্যে দু’-একটা নাটকে, জলসায় গান গেয়েছেন উত্তম। আরতি মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে’ গানটি তিনি নিজে গেয়েছেন। সেই গানের ‘অডিয়ো’ সমাজমাধ্যমে খুঁজলে আজও পাওয়া যায়।
পরিচালকের সঙ্গে আইনি লড়াই: উত্তমকুমারের কেরিয়ারে যত তিক্ত সময় এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া। অথচ, সেই পরিচালক তপন সিংহের সঙ্গে একসময় খুবই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল তাঁর। তপনের পরিচালনায় ‘উপহার’ (১৯৫৫), ‘ঝিন্দের বন্দি’ (১৯৬১), ‘আমাদের দেশ’ (১৯৬২) ও ‘জতুগৃহ’ (১৯৬৪) করেছেন উত্তম। এমনকি, ‘জতুগৃহ’ প্রযোজনা করেছিলেন উত্তম নিজেই, নায়িকা হয়েছিলেন তপন-জায়া অরুন্ধতীদেবী। সেই তপনবাবুর সঙ্গেই ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ (১৯৮০) ছবি ঘিরে আইনি জটে জড়ালেন তিনি।

আর সুযোগ মিলল না: উত্তমকুমার মুম্বইয়ে একটি হিন্দি ছবির শুটিংয়ে। এ দিকে, তপন ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ ডবল রোলের জন্য উত্তমকে প্রস্তাব দিলেন। শুটিংয়ের লোকেশন বাছা হল বারুইপুরের এক বাগানে, শীতের সময়। সেখানে কয়েকটি দৃশ্যের প্রয়োজনে সর্ষের খেত ও সব্জির বাগান করা হয়েছে। উত্তম জানালেন, মার্চের আগে সময় দিতে পারবেন না। মাথায় হাত পরিচালকের। দেরি হলে বাগান শুকিয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে সেই রোল দেওয়া হল দীপঙ্কর দে-কে। এটা শুনে তপনবাবুর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকলেন উত্তম। হেরে গেলেন উত্তমই। পরে আর কোনও ছবিতে উত্তমকে নেওয়ার কথা ভাবেননি তপন। উত্তমের তখন একের পর এক ছবি চলছে না। ভাল ছবি করার জন্য উদ্গ্রীব। অনেকেই মনে করেন, ওই পরিস্থিতিতে নামী পরিচালকের সঙ্গে দ্বৈরথের জেরে ক্ষতিই হয়েছিল উত্তমের।
সামাজিক কাজে দলবিচার করতেন না: রুপোলি জগতের শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের কথা ভুলতেন না উত্তমকুমার। মাধবী মুখোপাধ্যায় আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘খরা বা বন্যার সময়ে দেখেছি, শিল্পীদের নিয়ে রাস্তায় নেমে ভিক্ষা করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন উত্তমকুমার। সেই টাকা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অবলীলায় দান করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দল বিচার তিনি কখনও করেননি। ১৯৭৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলার ত্রাণের জন্য ইডেন গার্ডেন্সে মুম্বইয়ের শিল্পীদের সঙ্গে চ্যারিটি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সেখানেও ছিলেন উত্তমকুমার। যে টাকা উঠেছিল, তা তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।’’ এই সাক্ষাৎকারেই মাধবী অভিযোগ করেছিলেন, এমন নির্বিরোধী একটি মানুষ মারা যাওয়ার পরে তাঁর মরদেহ রবীন্দ্রসদনে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।