রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো সরকার-প্রধান হতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর মাত্র একদিন পরই তার নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হবে। সব কিছু ঠিক থাকলে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ হবে নতুন মন্ত্রিসভার। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ের পর থেকেই আলোচনা শুরু হয় আগামীর ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হচ্ছেন তিনি।
সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই দলটির নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। আর গুলশান কার্যালয়ে বাড়তে থাকে শীর্ষ নেতাদের পদচারণা। টানা কর্মব্যস্ততা বাড়তে থাকে দলীয় চেয়ারম্যানের। কখনও দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথন, সরকার গঠনের প্রস্তুতি, জোটসঙ্গী ও সারা দেশ থেকে আগত নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শুভেচ্ছা গ্রহণ ও মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাইয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন তিনি।
এছাড়া নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গেও দেখা করবেন রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায়। আগামী রাষ্ট্রপরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারা প্রবর্তন করতে তার এই সাক্ষাৎ বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না তারেক রহমান।
নির্বাচনের দিন মধ্যরাত পর্যন্ত কেটেছে গুলশান কার্যালয়ে
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। তখন তার কথা, অঙ্গভঙ্গিতেই উচ্ছ্বাসের প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে। ফুরফুরে মেজাজে তিনি বলেন, ‘‘ধানের শীষের জয় অবশ্যম্ভাবী।’’
দেশের বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকার খোঁজ-খবর নেন। এক ধরনের নিশ্চিত জয়ের সংবাদ নিয়েই মধ্যরাতে বাসায় ফেরেন। সেদিনই তিনি বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেন। এর পরিবর্তে পরদিন সারা দেশে দোয়া-মাহফিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
নৌবাহিনী মসজিদে অংশ নিলেন দোয়া মাহফিলে
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নৌবাহিনী জামে মসজিদে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করেন তারেক রহমান। নামাজের পর তিনি দোয়া মাহফিল ও মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।
মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গুলশান কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক করেন তারেক রহমান। এতে আগামী সরকারে কারা থাকতে পারেন, সে বিষয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন তিনি। শুধুই মন্ত্রিসভা নয়, সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে কারা স্থান পেতে পারেন, তাদের বিষয়ে চুলচেরা পর্যালোচনা করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান জানান, অতীতে চারিত্রিক কালিমা নেই বা ব্যক্তিগতভাবে ক্লিন ইমেজের অধিকারী—এমন নেতাদের বাছাইয়ে প্রাধান্য দিচ্ছেন তারেক রহমান।
ওই বৈঠক থেকে বের হয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘‘বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নেতাকর্মী ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দেশ পরিচালনার রূপরেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।’’
তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘‘সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিএনপি রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনই লক্ষ্য। এ জন্য যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করা হচ্ছে।’’
এছাড়া এ নিয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠক হয়েছে বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ফুরফুরে মেজাজে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং, আত্মবিশ্বাসের ছাপ
নির্বাচনের তৃতীয় দিনে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ করেন তারেক রহমান। সেখানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। আরও ছিলেন দেশের বিশিষ্টজনরা।
সেখানে তিনি হাত নেড়ে সবাইকে অভিবাদন জানান। বলেন, আজ থেকে সবাই স্বাধীন। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়ে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়বেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দেন তারেক রহমান। এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের ছাপ ছিল তার বক্তব্যে।
‘‘নির্বাচনে ২০০ আসন নিশ্চিতে আপনাকে কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হয়েছে কিনা’’, সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘‘জনগণকে কনভিন্স করাটাই ছিল আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। যাতে আমাদের পক্ষে আসেন, আমাদের ভোট দেন, আমরা সেটাই করেছি। আমরা তাদের মন জয় করেছি।’’
বিজয়ী নেতাদের পাশাপাশি পরাজিতদেরও সময় দিচ্ছেন
নির্বাচনের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন আসন থেকে বিজয়ী নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। সবাইকে আন্তরিকভাবে সময় দিচ্ছেন। সর্বশেষ রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চাঁদপুরের আ ন ম এহসানুল হক মিলন, নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন ও ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত রবিউল আলম রবিসহ বেশ কয়েকজন নেতার শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন তিনি।