আওয়ামী লীগের ‘জয় বাংলা জিতবে এবার নৌকা’ গানটি শুধু একটি প্রচারণা ছিলো না, হয়ে উঠেছিল নির্বাচনী আবহের প্রতীক। মাইকিং আর পোস্টারের যুগ পেরিয়ে সেই গানই দেখিয়ে দিয়েছিলো সুর-ছন্দ-চিত্রকল্প মিলিয়ে একটি গান কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে আবেগ, পরিচয় ও বার্তা একসঙ্গে ছড়িয়ে দিতে পারে। সেই অভিজ্ঞতার রেশ ধরেই আজকের সংসদ নির্বাচন আরও বেশি গানের, আরও বেশি ডিজিটালের, আরও বেশি তরুণমুখী।
এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রকাশ করেছে তাদের নির্বাচনী থিম সং ‘ভোট দিবেন কিসে ধানের শীষে’। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই গানে ব্যবহার করা হয়েছে দলের পরিচিত স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আজগর হোসেন রাব্বির কথা ও সুরে গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আতিয়া আনিশা ও নিলয়। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওজুড়ে। সেখানে দেখা গেছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভঙ্গিতে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে মাদুর পেতে তারা উদ্বোধন করেছে নিজেদের নির্বাচনী গান। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার বক্তব্যে উঠে আসে ‘জনগণের কাছাকাছি থাকা’র বার্তা। ফাইভ স্টার হোটেলের বদলে উন্মুক্ত স্থানে আয়োজন করে এনসিপি জানাতে চেয়েছে, রাজনীতি সবার, আর প্রচারণাও সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত।
জামায়াতে ইসলামীর কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী গান না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সমর্থিত অনেক গানই পাওয়া যাচ্ছে। সেইসব গানে জামায়াতের আদর্শ, চেতনা ও মূল্যবোধের গল্প তুলে ধরা হচ্ছে। কোনো কোনো গানে রাজনৈতিক বাহাসও উপস্থিত। এসবের ভিড়ে একটি গান ব্যাপক আলোচনায় আসে। ‘নৌকা, ধানের শীষ আর লাঙল দেখা শেষ; দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ’ – এই গানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীকের উল্লেখ করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দাবি তোলা হয়। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে গানটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য দলগুলোকেও ডিজিটাল কনটেন্টে আরও মনোযোগী হতে উৎসাহিত করে। গানটির সুরকার ও শিল্পী, লন্ডনভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা এইচ এ এল বান্না।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেও গান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মাঠপর্যায়ের প্রচারণা এবং অনলাইনে মাসের পর মাস ধরে সক্রিয়তা মিলিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ‘জেন- জি’ ভোটারদের লক্ষ্য করে তৈরি হচ্ছে এসব কনটেন্ট। তারাই ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে এবার ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলবেন এই ভোটারেরাই। আর তরুণদের নজর কাড়তেই প্রকাশ হচ্ছে নানা দলের থিম সং। অনেক প্রার্থী আবার নিজ উদ্যোগে নিজের নাম ও মার্কা নিয়েও গান তৈরি করছেন।
শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে ভোটারদের উৎসাহ দিতে প্রচার করা হচ্ছে নানা রকম থিম সং। পাশাপাশি নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষে দেশের আট বিভাগের জন্য আটটি গান তৈরি করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। যা সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দিন থেকে রাত- বেজে চলেছে সেইসব গান। পথ থেকে পথে, শহর-নগর-বন্দর, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে মানুষের অন্তরে অন্তরে।