রাজশাহীর দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন চোখ জুড়ানো দৃশ্য। বিস্তীর্ণ ফসলি জমিন সরিষার হলুদ ফুলে ঢেকে গেছে। বাংলা পৌষ মাসের কনকনে ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়ায় দুলছে সরিষার ফুল, আর সেই ফুলে ফুলে ছুটে বেড়াচ্ছে মৌমাছি। হলুদের এই গালিচায় যেন প্রাণের উৎসব। সরিষা খেতের পাশেই সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। একদিকে মধু সংগ্রহ, অন্যদিকে মৌমাছির পরাগায়ণে বাড়ছে সরিষার ফলন—দুটোতেই লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি রবি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে। রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন চারটি জেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমি থেকে ৩ লাখ ৬ হাজার টন এবং বগুড়া কৃষি অঞ্চলের চারটি জেলায় ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমি থেকে আরও ৩ লাখ ৪০ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রায় ৭ টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
সরিষার মাঠে মধু সংগ্রহ শুধু অতিরিক্ত আয় নয়, অনেক কৃষকের জন্য এখন প্রধান জীবিকার অংশ হয়ে উঠেছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান প্রায় এক দশক ধরে সরিষা খেত থেকে মধু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, আমন ধান কাটার পর জমি তৈরি করে সরিষা আবাদ করা হয়। মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে ওঠে। এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ হয় আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ফলন পাওয়া যায় ৭ থেকে ৮ মণ। এর পাশাপাশি মৌবাক্স বসিয়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
একই উপজেলার পূর্ব বামনাল গ্রামের কৃষক আবির হোসেন জানান, তিনি প্রতি মৌবাক্স থেকে গড়ে প্রায় ৫ কেজি মধু সংগ্রহ করেন। শীত মৌসুমে সরিষা খেতের মধু বিক্রি করে তার আয় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি হয়। তিনি বলেন, “আগে শুধু ফসলের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। এখন বুঝেছি, মৌমাছি থাকলে ফসলও ভালো হয়, আয়ও বাড়ে।”
শুধু স্থানীয় কৃষকরাই নন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মৌচাষিরা রাজশাহীর সরিষা খেতে ছুটে আসছেন। যশোরের মৌচাষি আমিরুল ইসলাম বাগমারা উপজেলায় ৩০০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একাই ৪ হাজার ৫০০ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। একই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সাতক্ষীরার মৌচাষি পলাশ এবং স্থানীয় খামারি রাকিব হোসেন। রাকিব বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে এখানে মধু সংগ্রহ করছি। প্রতিবারই ভালো লাভ হয়েছে।”
বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে সরিষা খেতের সঙ্গে মধু সংগ্রহ অনেক কৃষকের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এতে তাদের আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরিষা গাছে ফুল ফোটার পর এখন অসংখ্য কৃষক বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
তানোর উপজেলার কৃষক আলী হোসেন জানান, সরকারি সহায়তা তাদের আরও উৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, “সরকারি উদ্যোগে সরিষার উন্নত বীজ, সার, মৌমাছি, প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল মধু সংগ্রহের বাক্স ও সরঞ্জাম পেয়েছি। এই সহায়তা না পেলে হয়তো এত বড় পরিসরে কাজ শুরু করা সম্ভব হতো না।”
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, সরিষা চাষের সঙ্গে মধু সংগ্রহ একটি লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। গোদাগাড়ী উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার বলেন, “প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষকদের মধু সংগ্রহে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে মধু সংগ্রহকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সরিষা চাষের পাশাপাশি এটি একটি টেকসই আয়মুখী কার্যক্রম।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকায় মধু আহরণ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং মধু উৎপাদনও বাড়ছে। তিনি বলেন, “সরিষার ফলন বৃদ্ধির কার্যকর উপায় হিসেবে যৌগিক চাষ বা সমন্বিত চাষ পদ্ধতি এখন ক্রমেই স্বীকৃতি পাচ্ছে।”
তবে এই সম্ভাবনাময় খাত টিকিয়ে রাখতে মৌচাষিরা সরিষা খেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কীটনাশকের কারণে মৌমাছি মারা গেলে মধু উৎপাদন যেমন কমবে, তেমনি পরাগায়ণের অভাবে ফসলের ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রেদওয়ানুর রহমান মনে করেন, মধু খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তাহলে সরিষার হলুদ মাঠে মৌমাছির এই ব্যস্ততা ভবিষ্যতেও কৃষকের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করবে।