জিডি করেও রক্ষা হয়নি শাকিলের জীবন,পুলিশের দায় কি শুধু প্রত্যাহার?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

হুমকির কথা আগেই জানিয়েছিলেন ছাত্রদল নেতা, থানায় করেছিলেন সাধারণ ডায়েরি; ১২ দিনের লড়াই শেষে মৃত্যু, উঠছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

একটি প্রাণ চলে গেল। একটি পরিবার হারাল তাদের সন্তানকে, একটি বাবা হারালেন বুকের ধন। অথচ মৃত্যুর আগেই সেই তরুণ জানিয়েছিলেন নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা। ফেসবুকে প্রকাশ্যে লিখেছিলেন, তাঁকে হত্যার জন্য লোক খোঁজা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে টাকা দেওয়ার প্রলোভন। বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, থানায় করেছিলেন সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। তারপরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো গেল না। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)।

এখন তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নানকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের জীবন রক্ষায় পুলিশের দায়িত্ব কি শুধু একজন কর্মকর্তাকে থানা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? যে তরুণ আগেই হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কেন তাঁর আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেল না? আর হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল?

শাকিলের মৃত্যু এসব প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। একটি সাধারণ ডায়েরি যদি সম্ভাব্য বিপদের আগাম সংকেত হয়, তবে সেই সংকেত উপেক্ষিত হলে তার দায় কে নেবে এ প্রশ্নের উত্তর এখন শাকিলের পরিবারসহ সাধারণ মানুষও জানতে চাইছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আশিক সাঈদের স্বাক্ষরিত আদেশে ওসি আবদুল হান্নানকে প্রত্যাহার করা হয়। আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁকে জনস্বার্থে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আদেশ জারির দিনই তাঁকে গুরুদাসপুর থানা থেকে অবমুক্ত করে ডিআইজির কার্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত কি শাকিলের পরিবারের ক্ষত কিছুটা হলেও কমাতে পারবে? যে সন্তানকে হারিয়ে একটি পরিবার শোকে পাথর হয়ে গেছে, তাদের কাছে একজন ওসির প্রত্যাহার কি ন্যায়বিচারের সমার্থক? শাকিলের বাবার অভিযোগ, পুলিশের কাছে আগেই বিপদের কথা জানানোর পরও তাঁর ছেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন শাকিল। হেলমেট পরা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় তারা। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

একটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা ছিল, কী কারণে এই হামলা, কারা পরিকল্পনা করেছে এবং কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। তবে শাকিলের মৃত্যুর ঘটনাকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে তাঁর আগের সেই নিরাপত্তাহীনতার বার্তা।

গত ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে শাকিল লিখেছিলেন, তিনি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। তাঁকে হত্যার জন্য একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন চক্র ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যারা তাঁকে হত্যা করতে পারবে, তাদের অর্থ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

শাকিলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি তিনি থানার ওসিকে জানিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। নিজের কিছু হয়ে গেলে ওই ডায়েরির ভিত্তিতে মামলা করার অনুরোধও জানিয়েছিলেন তিনি।

একজন নাগরিক যখন সম্ভাব্য হত্যার আশঙ্কা জানিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন, তখন বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল, সেটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জিডি করার পর অভিযোগের সত্যতা যাচাই, হুমকির ধরন মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অবশ্য সাধারণ ডায়েরি করলেই কোনো অপরাধ ঘটবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভাব্য গুরুতর অপরাধের আগাম তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার জবাবদিহি থাকা জরুরি। বিশেষ করে যখন সেই আশঙ্কার কয়েক মাস পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

শাকিলের বাবা রবিউল ইসলামও অভিযোগ করেছেন, তাঁর ছেলে হুমকি পাওয়ার পর থানায় জিডি করেছিলেন। তারপরও তাঁকে রক্ষা করা যায়নি। ছেলের মৃত্যুর পরও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা দেখতে পাননি বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

শাকিলের বাবা ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রথমে হত্যাচেষ্টার মামলা করা হয়েছিল। পরে শাকিলের মৃত্যুর পর ঘটনাটি হত্যা হিসেবে তদন্তের আওতায় আসে। এজাহারে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেলের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরে তা বাদ দেওয়ার বিষয়েও তিনি অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের নির্দেশনা ভূমিকা রেখেছিল। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শাকিল হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে মঙ্গলবার বিকেলে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন। একই দিন তাঁকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল।

তবে গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে নেওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। একইভাবে, শাকিলের বাবা যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়াও জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়, সেটিই প্রত্যাশা।

এদিকে শাকিলের জানাজায় অংশ নিতে আসা কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয় দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডে অন্য ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ থেকে এ ঘটনা ঘটে। তবে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে নতুন করে সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব অভিযোগেরও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

শাকিলের মৃত্যুতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে শেষ করা যায় না। ওসি আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ কতটা সত্য, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে। জিডির নথি, অভিযোগ গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি, পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ, সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে অনুসন্ধান এবং হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের অগ্রগতি সবকিছু পর্যালোচনা করা জরুরি।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখারের আলম জানিয়েছেন, ওসি আবদুল হান্নানকে জনস্বার্থে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু জনস্বার্থের প্রকৃত প্রতিফলন তখনই ঘটবে, যখন শাকিল হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত হবে, অপরাধে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং পুলিশের কোনো সদস্যের অবহেলা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কারণ, পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা নেওয়া কিংবা আসামি গ্রেপ্তার করা নয়; আইন অনুযায়ী সম্ভাব্য অপরাধের ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্বের অংশ। কেউ যখন আগেই হত্যার আশঙ্কা জানান, তখন সেই অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

শাকিলের বাবা-মায়ের কাছে এখন আর কোনো আশ্বাস তাঁদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাঁদের ক্ষতি অপূরণীয়। কিন্তু এই মৃত্যু থেকে রাষ্ট্র ও পুলিশের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনো তরুণ যেন হত্যার হুমকি জানিয়ে থানায় জিডি করার পরও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতে বাধ্য না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

শাকিলের মৃত্যু আমাদের সামনে এই কঠিন প্রশ্নই রেখে গেছে। একজন কর্মকর্তা প্রত্যাহার হতে পারেন, তদন্ত কমিটি হতে পারে, মামলা চলতে পারে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন হত্যার পেছনের সত্য উদ্‌ঘাটিত হবে, অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হবে এবং দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

শাকিল বেঁচে থাকতে সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁর সেই আকুতি কেন যথাযথ গুরুত্ব পেল না, তার উত্তর প্রয়োজন। শুধু শাকিলের পরিবারের জন্য নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার স্বার্থে।

একটি সাধারণ ডায়েরির পরিণতি যদি শেষ পর্যন্ত একটি লাশ হয়, তবে সেই ঘটনার তদন্তে শুধু হত্যাকারীদের নয়, আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করেছিল, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একটি প্রাণের মূল্য প্রশাসনিক প্রত্যাহারের চেয়ে অনেক বড়। শাকিলের পরিবারের প্রাপ্য শুধু সহানুভূতি নয় সত্য উদ্‌ঘাটন, ন্যায়বিচার এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ