অপরাধের নেপথ্যের হোতাদের ধরতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে নির্দেশ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে অপরাধের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। শুধু মাদক বিক্রেতা কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; এসব অপরাধের পেছনে কারা অর্থ, আশ্রয় ও প্রভাব জোগাচ্ছে, তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। সভায় মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সভায় মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে সায়েদুর রহমান বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। অর্থাৎ অপরাধের ধরন, অপরাধীর পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার এবং কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। মাদক কেনাবেচা, কিশোরদের দলবদ্ধ সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ছিনতাই এবং বিভিন্ন অপরাধে তাদের ব্যবহারের অভিযোগ জননিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক সময় অল্পবয়সী সদস্যরা সরাসরি গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা অর্থদাতা, সংগঠক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আড়ালে থেকে যান। ফলে অপরাধের মূল কাঠামো অক্ষত থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ কারণে অপরাধ দমনে শুধু দৃশ্যমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা নয়, অপরাধের উৎস ও সহযোগীদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কাউকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে এগোতে হবে। ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাবের কারণে কাউকে হয়রানি না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের পেশাদারত্বের অন্যতম শর্ত।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং এলাকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগ কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মাদকের সহজলভ্যতা এবং অপরাধীদের প্রলোভনের মতো বিষয়গুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি নেওয়া জরুরি।

সায়েদুর রহমান মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে দায়িত্ব পালনের প্রতিটি পর্যায়ে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। অপরাধ দমনের নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সভায় ডাকাতির মামলা যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা এবং দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণে অনীহা কিংবা তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ধর্ষণ মামলার তদন্ত নিবিড়ভাবে তদারক করার নির্দেশও দেন অতিরিক্ত আইজি। এসব মামলায় অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে দুর্বলতা থাকলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তদন্তের মান উন্নত করার পাশাপাশি মামলার বিচারিক কার্যক্রমে অগ্রগতি আনতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং কার্যক্রম আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তির অধিকারী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে এসব কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন সায়েদুর রহমান। স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

সভায় সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনে দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান অতিরিক্ত আইজি। তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত সভায় সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও অপহরণের মামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের চিত্র তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি, মামলা নিষ্পত্তির হার এবং অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

তবে মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের নির্দেশনার কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নের ওপর। নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধী চক্র শনাক্ত, মাদকের সরবরাহপথ বন্ধ এবং অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের প্রকৃতি ও আইনের বিধান বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের ঘোষিত কঠোর অবস্থান জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এই অবস্থানকে কার্যকর করতে হলে অপরাধী চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি তদন্তের মান, মামলা নিষ্পত্তি এবং পুলিশের প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে অভিযানের ফলাফল ও অপরাধ পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করা গেলে পুলিশের কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করাও সহজ হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ