শফিকুল আলম সেলিম
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের ইতিহাসে কুমিল্লার রয়েছে এক বিশেষ স্থান। প্রাচীন জনপদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের সৃজনশীলতা, পারিবারিক শ্রম এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা কারুশিল্পের দক্ষতা কুমিল্লাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। মাটির তৈরি সামগ্রী, বাঁশ-বেতের পণ্য, তাঁতশিল্প, নকশিকাঁথা, হস্তশিল্প ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতিতে অবদান রেখে আসছেন। কুমিল্লার কুটিরশিল্প কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুমিল্লার কুটিরশিল্পের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে খাদি কাপড়ের নাম। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশীয় বস্ত্র ব্যবহারের যে আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল, তার সঙ্গে কুমিল্লার খাদিশিল্পের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হাতে সুতা কাটা এবং তাঁতে কাপড় বোনার ঐতিহ্য এ শিল্পকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে খাদি কাপড়ের নকশা, রং ও ব্যবহারে বৈচিত্র্য এসেছে। বর্তমানে খাদি দিয়ে শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, পোশাক ও বিভিন্ন ফ্যাশনপণ্য তৈরি করা হয়।
কুমিল্লার খাদি শিল্পের বিশেষত্ব হলো এর দেশীয় উপকরণনির্ভরতা, স্বতন্ত্র বুনন এবং ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য। স্থানীয় তাঁতি, কারিগর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিপণনকারীদের শ্রমে এ শিল্প টিকে আছে। তবে আধুনিক যন্ত্রে তৈরি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতা এ শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে মাটি দিয়ে তৈরি করছেন হাঁড়ি, পাতিল, কলস, ফুলদানি, প্রদীপ, খেলনা ও নানা শৌখিন সামগ্রী। তাঁদের দক্ষ হাতে সাধারণ মাটি হয়ে ওঠে ব্যবহারিক ও নান্দনিক পণ্য। গ্রামীণ জীবনে এসব সামগ্রীর একসময় ছিল ব্যাপক ব্যবহার। বর্তমানে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণের প্রসারে মাটির পণ্যের দৈনন্দিন ব্যবহার কমেছে। তারপরও পরিবেশবান্ধব পণ্য ও ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে মৃৎশিল্পের নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
মৃৎশিল্পীদের বড় সমস্যা হলো কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানি ব্যয়, পণ্যের ন্যায্য দাম এবং পর্যাপ্ত বিপণনব্যবস্থার অভাব। তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্প নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
কুমিল্লার গ্রামীণ জনপদে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, মোড়া, কুলা এবং নানা গৃহস্থালি সামগ্রীর ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় কারিগরেরা সহজলভ্য উপকরণকে ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করেন। এসব কাজে পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ থাকায় কুটিরশিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া সেলাই, সূচিশিল্প, নকশিকাঁথা এবং হাতে তৈরি বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী উৎপাদনের মধ্য দিয়ে নারীরাও কুটিরশিল্পে অবদান রাখছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির কাজের পাশাপাশি এসব পণ্য তৈরি করে তাঁরা পরিবারের আয়ে সহায়তা করেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নকশার উন্নয়ন ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কুটিরশিল্পের সবচেয়ে বড় অবদান হলো স্বল্প পুঁজি দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। কৃষিকাজের পাশাপাশি অনেক পরিবার হস্তশিল্পের মাধ্যমে বাড়তি আয় করে। উৎপাদন, কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন, পাইকারি বিক্রি ও খুচরা বিপণনের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাও এ শিল্প থেকে উপকৃত হন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কুটিরশিল্প আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
তবে এ অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন শিল্পভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, কারিগরদের নিবন্ধন এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ। কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন বিপণন ও রপ্তানির উপযোগী করে তোলাও জরুরি।
কুমিল্লার কুটিরশিল্পের সামনে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং পণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়া কারিগরদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী কিছু কারুশিল্প।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ, মানসম্মত কাঁচামাল সরবরাহ এবং স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কুমিল্লার খাদি, মৃৎশিল্প ও অন্যান্য হস্তশিল্পের পরিচিতি বাড়াতে নিয়মিত মেলা, প্রদর্শনী এবং অনলাইন বিপণনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে এসব শিল্পের সংযোগ তৈরি হলে নতুন ক্রেতা সৃষ্টি হবে।
কুমিল্লার কুটিরশিল্প এ অঞ্চলের মানুষের পরিশ্রম, মেধা ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্প শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও বড় ভূমিকা রাখবে। মাটির গন্ধ, তাঁতের শব্দ আর কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা মানে কুমিল্লার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।