কুমিল্লার মৃৎশিল্পীদের অসহায় জীবন: মাটির কারিগরদের চোখে বেঁচে থাকার লড়াই

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

কুমিল্লার মাটিতে মিশে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদান। সেই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মৃৎশিল্প। এঁটেল মাটি, পানি আর নিপুণ হাতের স্পর্শে মাটির দলা হয়ে ওঠে কলস, হাঁড়ি, পাতিল, ফুলদানি, পুতুল ও নানা শৌখিন সামগ্রী। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসব পণ্যের ছিল অপরিহার্য ব্যবহার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক পণ্যের বিস্তার এবং বাজারসংকটে কুমিল্লার মৃৎশিল্পীরা আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বংশপরম্পরায় পাওয়া এই পেশা আঁকড়ে ধরে অনেকেই এখন জীবিকা নির্বাহের সংগ্রামে দিশেহারা।

মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকার কারিগরেরা মাটি দিয়ে তৈরি করছেন ব্যবহার্য ও সৌন্দর্যবর্ধক সামগ্রী। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ মাটি পায় শিল্পের রূপ। কিন্তু যাঁদের শ্রমে এই ঐতিহ্য টিকে আছে, তাঁদের জীবনেই আজ অনিশ্চয়তার ছায়া।

একসময় মাটির হাঁড়ি, কলস, সরা, থালা ও পাতিল ছিল গ্রামীণ জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। এখন এসব পণ্যের জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণ। সহজে বহন করা যায়, ভাঙার ভয় কম এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এমন সুবিধার কারণে ক্রেতারা ঝুঁকছেন বিকল্প পণ্যের দিকে।

ফলে মৃৎশিল্পীদের তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যাঁরা একসময় নিয়মিত মাটির সামগ্রী বিক্রি করে সংসার চালাতেন, তাঁদের অনেককে এখন পণ্য বিক্রির জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। উৎপাদন করেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বাড়ছে হতাশা।
তবে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। গৃহসজ্জা, রেস্তোরাঁ, উপহারসামগ্রী, নার্সারির টব এবং বিভিন্ন উৎসবের আয়োজনে এসব পণ্যের ব্যবহার রয়েছে। পরিকল্পিত বিপণন ও নতুন নকশার মাধ্যমে এই বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ আছে।

মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি। কিন্তু মাটি সংগ্রহ, প্রস্তুতকরণ, পণ্য তৈরি, শুকানো, পোড়ানো এবং বাজারে পৌঁছানো প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জ্বালানি, পরিবহন এবং অন্যান্য উপকরণের খরচ। অথচ উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সব সময় সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হয় না।
মৃৎশিল্পীদের বড় একটি অংশের পুঁজি সীমিত। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তাঁরা আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত চুল্লি কিংবা পণ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন না। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পণ্যের মান উন্নত করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, মাটির তৈরি পণ্য ভঙ্গুর হওয়ায় পরিবহনে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। যথাযথ প্যাকেজিং ও নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা না থাকলে দূরের বাজারে পণ্য পাঠানোও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের অনেকে এখন বিকল্প পেশার সন্ধান করছেন। দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও যখন নিশ্চিত আয় পাওয়া যায় না, তখন নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশা আকর্ষণ হারায়। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা এবং ঐতিহ্যবাহী নকশা তৈরির কৌশল।

একজন দক্ষ মৃৎশিল্পী তৈরি হতে সময় লাগে। মাটির ধরন বোঝা, চাকায় নিখুঁতভাবে পাত্র তৈরি, শুকানোর সঠিক পদ্ধতি এবং আগুনে পুড়িয়ে পণ্য শক্ত করার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। এই জ্ঞান লিখিত বইয়ের চেয়ে পারিবারিক শিক্ষা ও হাতে-কলমে কাজের মধ্য দিয়েই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্ম এই কাজে যুক্ত না হলে সেই দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

কুমিল্লার মৃৎশিল্পীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। প্রথমত, তাঁদের সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক নকশা, পণ্য উন্নয়ন, রং ব্যবহার, নিরাপদ চুল্লি পরিচালনা এবং অনলাইন বিপণনের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মৃৎশিল্প মেলার আয়োজন এবং পর্যটনকেন্দ্র ও বিপণিবিতানে পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
মৃৎশিল্পীদের জন্য সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পণ্য বিক্রিতে ব্যয় কমতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বাজার ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃৎশিল্পীদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। তাঁদের তৈরি পণ্যকে শুধু ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কুমিল্লার মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম। তাঁদের হাতে গড়া মাটির পাত্রে যেমন বাংলার শেকড়ের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি তাঁদের ঘাম ও শ্রমে বেঁচে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিল্পজ্ঞান। যথাযথ সহায়তা, বাজারসুবিধা ও সামাজিক স্বীকৃতি পেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তা না হলে একদিন হয়তো মাটির তৈরি পণ্যের জায়গা থাকবে জাদুঘরে, কিন্তু সেই পণ্য গড়ার কারিগরদের জীবনকথা হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ