মব সন্ত্রাসে উদ্বিগ্ন জাতি, কোন পথে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

বাংলাদেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, দলবদ্ধ হামলা, গণপিটুনি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে একদল মানুষের হামলে পড়া শুধু একজন মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং সমাজে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ, অপরাধের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এসব বিষয় দলবদ্ধ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ আলাদা করে তদন্ত করা জরুরি।

মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের নিরাপত্তা, অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, পুলিশের দায়িত্ব, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা। একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগের বিচার হবে আইন অনুযায়ী, জনতার আবেগ কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায় নয়। অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন অপরাধ দমনের নামে আইনবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা কীভাবে ঠেকানো হবে এবং নাগরিকের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে?

সাম্প্রতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস)

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন

স্থানে মব সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনায় অন্তত ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন।

সংগঠনটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত সংবাদ ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।

অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় ১৯৭ জন নিহত হন, যা ২০২৪ সালের ১২৮ জনের তুলনায় বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসের পরিসংখ্যানেও সংগঠনটি ১৭১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে। তবে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে বড় ব্যবধান রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৪০। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস ও নথিভুক্তির পার্থক্য এই ব্যবধানের কারণ কি না, তা স্পষ্ট করতে সমন্বিত ও স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন।

এই পরিসংখ্যান শুধু মৃত্যুর হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা, আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এসব হামলার প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন কিংবা হত্যা করা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মব সহিংসতার বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে পড়া, গুজবকে সত্য বলে ধরে নেওয়া, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধকে জনতার আবেগের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া এবং অপরাধের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননা কিংবা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে হামলায় অংশ নেওয়া কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সমস্যাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত মব সহিংসতার কোনো মামলাই তখন পর্যন্ত বিচারপর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রতিবেদনে রংপুরের তারাগঞ্জে চুরির সন্দেহে প্রদীপ দাস ও রূপলাল দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটিও উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিচারহীনতার ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে, আর সাধারণ মানুষ আইনগত প্রতিকারের ওপর আস্থা হারাতে পারে। তবে কোনো মামলার তদন্তে বিলম্ব হলেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়ী করা যায় না। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, তদন্তের মান, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, প্রসিকিউশনের প্রস্তুতি এবং আদালতের কার্যক্রম আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশকে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। গুজবের উৎস শনাক্ত করা, সহিংসতায় উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোথাও নিষ্ক্রিয় থাকলে বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক কোনো সম্প্রদায়কে দায়ী করা কিংবা প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে জনতাকে ব্যবহার করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে বিচারবহির্ভূত শাস্তি কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, ছবি কিংবা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না করে প্রচার করলে নিরপরাধ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একইভাবে সহিংসতার দৃশ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মর্যাদা, পরিবারের অনুভূতি এবং জনমনে সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মব সহিংসতা দমনে শুধু গ্রেপ্তার বা কঠোর বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও বুঝতে হবে, অপরাধের প্রতিবাদ করা এবং অপরাধের শাস্তি নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং দুর্বলতম নাগরিককেও আইনের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত। আজ যে মানুষটি অভিযোগের মুখে জনতার হামলার শিকার হচ্ছেন, কাল একই পরিস্থিতিতে অন্য যে কেউ পড়তে পারেন। তাই মব সহিংসতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে মানুষের মধ্যে ভয়, অবিশ্বাস ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি বাড়তে পারে। আর কার্যকর বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক সচেতনতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং জনতার শাসনের বদলে আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ