সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের অনলাইন ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পদক্ষেপ নেয়। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তাঝুঁকি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর এটি পুনরায় চালু করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে অফলাইনে রাখা হয়েছে। ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো পরীক্ষা করছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে ‘দ্য সার্ভিস ইজ আন্ডার মেইনটেন্যান্স’ বার্তা দেখা যায়। এতে জানানো হয়, ওয়েবসাইটটি রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে এবং শিগগিরই আবার চালু করা হবে। তবে ঠিক কখন ওয়েবসাইটটি সচল হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ওয়েবসাইট পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা জারি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা এসব ত্রুটি শনাক্ত করেছেন। ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা আক্রান্ত সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা চালাতে পারে। এতে সার্ভারের ফাইল, তথ্যভান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পিএইচপি এমন একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, যা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। ফলে এ ভাষার দুর্বলতা নিয়ে সতর্কতা জারির পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাই ও সফটওয়্যার হালনাগাদে উদ্যোগী হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সিআইআরটিও পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের সার্ভারে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ যাচাই, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা সাময়িকভাবে কিছু অনলাইন সেবা বন্ধ রেখেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল সেবায় প্রবেশ সীমিত করেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সফটওয়্যারে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ও তথ্যভান্ডার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্ভারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ।
তবে কোনো সফটওয়্যারে নিরাপত্তা ত্রুটি পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা হয়েছে এমন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনায় তথ্য চুরি, সার্ভার দখল কিংবা সফল সাইবার হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সাধারণত বিভিন্ন নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, বিজ্ঞপ্তি, পরিসংখ্যান ও আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে এসব তথ্য সংগ্রহে ব্যবহারকারীদের অসুবিধা হতে পারে।
তবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কারণে গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে কোন সমস্যা হবেনা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি মূলত নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করা হবে। তবে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ফলাফল, শনাক্ত হওয়া দুর্বলতার বিস্তারিত বিবরণ এবং ওয়েবসাইট চালুর নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর সাময়িক বন্ধ ডিজিটাল ভূমিসেবার সার্ভার।
পিএইচপিতে শনাক্ত নিরাপত্তা ত্রুটির পরিপ্রেক্ষিতে সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আগামীকাল শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিজিটাল ভূমিসেবার (land.gov.bd) সার্ভার বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টের ২২ অক্টোবরের জরুরি সাইবার সতর্কবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে সিস্টেমের নিরাপত্তা উন্নয়নের কাজ করা হবে।
এছাড়া বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের পর ভূমিসেবার জন্য কোনো ধরনের পেমেন্ট না করতে সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
এর আগে বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি বড় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার হুমকির মুখে নিরাপত্তা নিশ্চিতে গতকাল বৃহস্পতিবার নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।