সারাদেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনা ৪১৫

মাদ্রাসায় ৩৭ শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, ২৫ ছেলেশিশুর ঘটনায় শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। চলতি ২০২৬ সালে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে অন্তত ৩৭ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের তথ্য পেয়েছে দৈনিক প্রকৃতির সংবাদ। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ২৯ জন ছেলে ও আটজন মেয়ে। ছেলেশিশুদের মধ্যে ২৫ জনকে মাদ্রাসার শিক্ষকদের মাধ্যমে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদের মধ্যে একজন সহপাঠী এবং তিনজন মাদ্রাসার বাইরের ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে আট মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ বিভাজন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ৩৭ জনের সবাই মাদ্রাসাশিক্ষকের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঘটনাগুলোর অধিকাংশ ভুক্তভোগীর বয়স সাত থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। কয়েকটি ঘটনায় একই শিক্ষক একাধিক শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। প্রতিবেদনে এমন চারটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে একই শিক্ষক একাধিক ছেলেশিশুকে নির্যাতন করেছেন। তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে ছয় শিশুকে এবং অন্য চার শিক্ষকের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তিন শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি।
রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সে নির্যাতনের শিকার হয়। পরে বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ পেলে আদালতে অভিযোগ করা হয় এবং ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলা নথিভুক্ত হয়।
মার্কাজুল উলুম আশ-শারিয়াহ মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থী ও পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগ আনা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থী শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন করে এবং একপর্যায়ে সে শিক্ষকের কাছে সুরক্ষা চাইলে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় দুই শিক্ষক ও তিন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইসাপেক্ষ। মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে দারুল উলুম মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল বাশারের বিরুদ্ধে তিন আবাসিক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। একজন শিক্ষার্থীর পরিবারের করা মামলার পর ৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
ঢাকা স্ট্রিমের ৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের একজনের স্বজনের কাছে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় যান। পরে পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে। এ ঘটনাও একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের হাতে আবাসিক শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বায়তুল ফজল মাদ্রাসার শিক্ষক হোসাইন আহমেদের বিরুদ্ধে ১৩ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে। শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ৬ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষক হোসাইন আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি কয়েক মাস ধরে মাদ্রাসায় কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সদস্যরা জানতে চান কী ঘটেছে। একপর্যায়ে শিশুটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ জানায়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এ ধরনের অভিযোগে শুধু নির্যাতনের ঘটনা নয়, ভয়ভীতি দেখানো, প্রমাণ গোপন এবং শিশুকে অভিযোগ জানাতে বাধা দেওয়ার বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে ভিডিও ধারণ বা হুমকির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণসাপেক্ষ।
মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা শিশুদের একটি অংশ পরিবার থেকে দূরে আবাসিক পরিবেশে থাকে। ফলে নির্যাতনের শিকার হলে পরিবারের কাছে অভিযোগ পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। অনুসন্ধানে কয়েকটি ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় শিশুদের বক্তব্য, অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের চেষ্ঠা করলেও তা সম্ভব হয়নি।
১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন শিশু রাই সবার প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৩৩৬ শিশুর যৌন নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই সংখ্যা সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিশুদের নিয়ে; এটি শুধু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হিসাব নয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের ৪১৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি ঘটনা বিভিন্ন মাদ্রাসায় সংঘটিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ সংখ্যাও ২০২৬ সালের ৩৭ শিক্ষার্থীর অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যোগ করা যাবে না, কারণ সময়কাল ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আলাদা
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সরকারি তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় প্রতিবেদন তৈরির জন্য পুলিশ সদর দপ্তর, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য একত্র বরকাস্ত জরুরি। বিশেষ করে ভুক্তভোগীর বয়স, ঘটনার স্থান, অভিযুক্তের পরিচয়, মামলার অবস্থা, গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা দরকার।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠার পর শিশুর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাকে সামাজিক অপমান ও হয়রানি থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ