শফিকুল আলম সেলিম
প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানের যে শাখাটি নিরন্তর কাজ করে চলেছে, রসায়ন তার অন্যতম। আমাদের চারপাশের মাটি, পানি, বাতাস, খাদ্য, ওষুধ কিংবা জীবদেহের প্রতিটি কোষের ভেতরেই রয়েছে রসায়নের বিস্ময়কর উপস্থিতি। আর এই রসায়নকে সহজভাবে জানা, বোঝা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলার একটি আনন্দময় উপলক্ষ হলো ‘মোল দিবস’। প্রতিবছর ২৩ অক্টোবর রসায়নপ্রেমী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীরা দিবসটি উদ্যাপন করেন।
আমেরিকান রীতিতে তারিখ লেখার পদ্ধতি অনুসারে ২৩ অক্টোবরকে লেখা হয় ১০/২৩। আর সকাল ৬টা ২ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২ মিনিট পর্যন্ত সময়কে মোল দিবসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই তারিখ ও সময়ের মধ্যে রয়েছে রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুবক আভোগাদ্রো ধ্রুবকের প্রতীকী প্রকাশ। ৬.০২২ × ১০²³ সংখ্যাটি এক মোল পদার্থে থাকা নির্দিষ্ট মৌলিক কণার সংখ্যাকে নির্দেশ করে। এ কণা হতে পারে পরমাণু, অণু, আয়ন কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তা।
রসায়নের ভাষায় ‘মোল’ হলো পদার্থের পরিমাণ পরিমাপের একটি মৌলিক একক। আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতি বা এসআই-এর সাতটি মৌলিক এককের মধ্যে এটি অন্যতম। ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর এসআই সংজ্ঞা অনুযায়ী, এক মোল পদার্থে ঠিক ৬.০২২১৪০৭৬ × ১০²³টি নির্দিষ্ট মৌলিক সত্তা থাকে। সংখ্যাটি এত বড় যে সাধারণ জীবনের অভিজ্ঞতায় এর ব্যাপকতা কল্পনা করাও কঠিন। অথচ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কতটুকু পদার্থ অংশ নেবে, কতটুকু বিক্রিয়ক প্রয়োজন হবে কিংবা কতটুকু উৎপাদ তৈরি হবে, তা নির্ণয়ে এই ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম।
মোল দিবসের সূচনা হয়েছিল মূলত শিক্ষার্থীদের কাছে রসায়নকে আকর্ষণীয় করে তোলার একটি উদ্যোগ হিসেবে। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে ‘দ্য সায়েন্স টিচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি লেখা এই দিবসের ধারণা জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখে। সেই ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মরিস ওলার ১৫ মে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যাশনাল মোল ডে ফাউন্ডেশন’ বা জাতীয় মোল দিবস সংস্থা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের রসায়নচর্চায় উৎসাহিত করতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়।
মোল দিবসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, এটি কঠিন বৈজ্ঞানিক ধারণাকে আনন্দ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করে। এ উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা রসায়নভিত্তিক কুইজ, পরীক্ষণ, পোস্টার প্রদর্শনী, বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা ও মজার গাণিতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। মোল, আভোগাদ্রো ধ্রুবক, রাসায়নিক বিক্রিয়া ও পদার্থের পরিমাণের মতো বিষয়গুলো তখন আর কেবল পাঠ্যবইয়ের কঠিন অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও এ ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক দিবসের গুরুত্ব রয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে হাতে-কলমে পরীক্ষা, অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিদ্যালয় ও কলেজে মোল দিবস উপলক্ষে ছোট পরিসরে বিজ্ঞানমেলা, রসায়ন পরীক্ষণ এবং বিজ্ঞানীদের জীবন ও আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হওয়ার পাশাপাশি যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও অর্জন করবে।
বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিল্পায়ন ও নতুন প্রযুক্তির বিকাশে রসায়নের অবদান অনস্বীকার্য। নিরাপদ ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে পানি বিশুদ্ধকরণ, সার উৎপাদন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসায়নিক জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। তাই রসায়নকে ভয়ের বিষয় হিসেবে নয়, প্রকৃতিকে জানার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা দরকার।
মোল দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের বিশাল জগৎকে জানতে হলে ছোট ছোট ধারণার গভীরে প্রবেশ করতে হয়। একটি সংখ্যা, একটি একক কিংবা একটি সূত্রও মানবজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার অসাধারণ হাতিয়ার হতে পারে। ২৩ অক্টোবরের এই বিশেষ দিন তাই শুধু রসায়নবিদদের উদ্যাপন নয়; এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলার আহ্বান। বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত সমাজ গড়তে মোল দিবসের এই আনন্দময় বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র।
তথ্যগুলো আরও নির্ভুলভাবে সাজাও
ভূমিকাটি আরও আকর্ষণীয় করো
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও জোরালো করো