শিক্ষা মানুষের চোখে স্বপ্ন জাগায়, পরিবারকে আশার আলো দেখায়, আর একটি জাতিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। কিন্তু সেই শিক্ষা শেষ করেও যখন একজন তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকেন, তখন তাঁর চোখের স্বপ্ন ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসে। যে মা-বাবা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের মুখেও নেমে আসে হতাশার ছায়া। প্রশ্ন জাগে, শিক্ষিত হয়েও যদি কর্মসংস্থান না মেলে, তবে এই শিক্ষার সুফল কোথায়? তরুণদের স্বপ্নভঙ্গের দায় নেবে কে?
বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব এখন আর ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের পথে বড় বাধা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বেকার স্নাতকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য তরুণের দীর্ঘশ্বাস, পরিবারের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প।
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ করতে পরিবারের বছরের পর বছর অর্থ, শ্রম ও ত্যাগ বিনিয়োগ করতে হয়। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, কেউ নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগান। তাঁদের স্বপ্ন থাকে, সন্তান প্রতিষ্ঠিত হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। অথচ শিক্ষাজীবন শেষে সেই সন্তান যখন চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘোরেন, তখন তাঁর অসহায়ত্ব শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবারে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে অনেক তরুণ নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেন, যদিও কর্মসংস্থানের সংকটের দায় এককভাবে তাঁদের নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেই তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি পর্যাপ্ত নয়। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ধীরগতি।
সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আকর্ষণ অস্বাভাবিক নয়। চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন ও সামাজিক মর্যাদা তাঁদের এই পথে টানে। কিন্তু সরকারি পদ সীমিত, বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বিপুল। বছরের পর বছর নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক তরুণ তাঁদের জীবনের মূল্যবান সময় হারান। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ না থাকলে বিকল্প পেশায় যাওয়ার আগ্রহও কমে যায়।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রধান অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। কারণ, শুধু সরকারি নিয়োগ দিয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও উদ্যোগ গড়ে উঠলেই বাড়বে কাজের সুযোগ।
একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে তুলতে হবে। শুধু সনদ অর্জন নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি, ইন্টার্নশিপ এবং শিক্ষানবিশির ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা না করে দক্ষতাভিত্তিক পেশার মর্যাদা বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণের নামে অর্থ ব্যয় নয়, প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কাজ পেলেন, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্য পরিমাপের প্রধান মানদণ্ড।
নারী ও গ্রামীণ তরুণদের কর্মসংস্থানেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্যহীন নিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে না। বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে ভাষাশিক্ষা, স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষিত তরুণেরা দেশের বোঝা নন; তাঁরাই দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। তাঁদের কর্মক্ষমতাকে অব্যবহৃত রেখে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হতে পারে না। একটি ডিগ্রি অর্জনের পর তরুণের হাতে যখন কাজের বদলে হতাশা তুলে দেওয়া হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ভবিষ্যৎও।
তাই এখন আর আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও দৃশ্যমান ফলাফল। সরকার, বেসরকারি খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে। তরুণদের শুধু স্বপ্ন দেখালেই হবে না, সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগও দিতে হবে। কারণ, যে দেশের তরুণেরা কাজ পান না, সে দেশের উন্নয়নের স্বপ্নও একসময় ফিকে হয়ে আসে। শিক্ষিত তরুণদের হাতে সনদের পাশাপাশি কাজ তুলে দেওয়াই হোক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।