২২ অক্টোবর কবি জীবনানন্দ দাশ এর প্রয়ান দিবস

নিভৃতচারী কবি জীবনানন্দ দাশ: জীবনভর সংগ্রাম, মৃত্যুর পর অমরত্ব

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার জগতে জীবনানন্দ দাশ এক স্বতন্ত্র নাম। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি ও জীবনের গভীর অনুভূতি তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। জীবদ্দশায় আর্থিক অনটন, কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা ও সাহিত্যিক অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হলেও মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যকর্ম অর্জন করেছে ব্যাপক স্বীকৃতি।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ রূপসী বাংলা, বনলতা সেন, ধূসর পাণ্ডুলিপি ও মহাপৃথিবী বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের নিঃসঙ্গতা, সময়ের প্রবাহ ও জীবনের জটিল অনুভূতি গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ছেলেবেলায় মা কবি কুসুমকুমারী দাশের প্রভাবে জীবনানন্দের কবিতা লেখার সূচনা হয়। ১৯১৯ সালে বর্ষা আবাহন কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তখন তিনি ‘শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত’ নামে লিখতেন। পরে ‘জীবনানন্দ দাশ’ নামেই সাহিত্যজগতে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯২৭ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সালে জীবনানন্দ দাশ জন্ম গ্রহন করেণ। ১৯৩০ সালের ৯ মে ঢাকায় ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে কন্যা মঞ্জুশ্রী ও পুত্র সমরানন্দের জন্ম হয়। ব্যক্তিজীবনে সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেলেও স্থায়ী জীবিকার অভাব তাঁকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে।

জীবনানন্দ বিভিন্ন সময়ে কলকাতা, বাগেরহাট, দিল্লি ও বরিশালের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। ১৯২২ সালে কলকাতার সিটি কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯২৮ সালে কলেজের চাকরি হারানোর পর তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করলেও তাঁর কর্মজীবন কখনোই স্থিতিশীল ছিল না।

১৯৩৫ সালে তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে যোগ দেন। সেখানে অবস্থানকালে বিপুলসংখ্যক কবিতা রচনা করেন, যদিও সেগুলোর অনেকগুলো জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন। কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁর সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের বহু কবিতা প্রকাশিত হয়।

১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় মহাপৃথিবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অস্থিরতা ও মানবজীবনের সংকট তাঁর কবিতায় ছাপ ফেলেছিল। ১৯৪৬ সালে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটেও তিনি কবিতায় মানুষের সংকট ও সময়ের বাস্তবতা তুলে ধরেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে তিনি সপরিবারে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে স্বরাজ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে কাজ করলেও চাকরিটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তাঁকে গৃহশিক্ষকতা, বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজসহ নানা পেশায় যুক্ত হতে হয়। তাঁর স্ত্রী লাবণ্যও স্কুলে শিক্ষকতা করে সংসারের ব্যয় নির্বাহে সহযোগিতা করেন।

জীবনানন্দের কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মসমালোচনা। তিনি অসংখ্য কবিতা লিখলেও জীবদ্দশায় অল্পসংখ্যক কবিতা প্রকাশের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন। রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থাকলেও তিনি তা প্রকাশ করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কৃত হয় এবং ১৯৫৭ সালে রূপসী বাংলা নামে প্রকাশিত হয়।

১৯৫২ সালে বনলতা সেন নতুনভাবে প্রকাশিত হলে বইটি পাঠকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালে এই গ্রন্থের জন্য তিনি ভারতের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের কাছে ট্রামলাইন পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন জীবনানন্দ। তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ অক্টোবর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জীবনানন্দ দাশের জীবন ছিল সংগ্রামময়, কিন্তু তাঁর সাহিত্য আজও পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়। জীবদ্দশায় যে কবি আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সীমিত স্বীকৃতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, মৃত্যুর পর তাঁর কবিতাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সৃষ্টির আবেদন সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজও পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে আছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ