উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান হিসেবে অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক ব্রিটিশ ভারতের বাংলার প্রধানমন্ত্রী থেকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং দেশটির দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনৈতিক জীবনের শীর্ষে পৌঁছালেও নানা সংকট, ভাষা আন্দোলন, দলীয় বিরোধ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে তাঁর শাসনামল হয়ে ওঠে বিতর্কিত। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই বছরের মাথায় তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
খাজা নাজিমুদ্দিন ১৮৯৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার নবাব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খাজা নিজামুদ্দিন এবং মাতা নওয়াবজাদী বিলকিস বানু। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল উপমহাদেশের মুসলিম অভিজাত সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এই পারিবারিক পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষাজীবনে তিনি ব্রিটেনের ডানস্টেবল গ্রামার স্কুল, ভারতের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি হলে পড়াশোনা করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রক্ষণশীলতার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
ব্রিটিশ ভারতে ফিরে তিনি বাংলার রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯২২ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলার শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ধীরে ধীরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
১৯৩৪ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে নাইট উপাধি লাভ করেন। এর আগে ১৯২৬ সালে তাঁকে কম্পেনিয়ন অব দ্য অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার (সিআইই) সম্মানে ভূষিত করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও স্বাধীনতার প্রশ্নে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি ১৯৪৬ সালে নাইট উপাধি ত্যাগ করেন।
১৯৪৩ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে হয়। সে সময় বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগের প্রভাব বাড়ছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নতুন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর তিনি দেশটির গভর্নর জেনারেল হন। ওই পদে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র ছিল প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।
১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে একজন বাঙালি রাজনীতিক হিসেবে তিনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সুসংহত করার উদ্যোগ চলতে থাকে।
১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানের মূলনীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগে বেসিক প্রিন্সিপলস কমিটি গঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে মতবিরোধ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বের পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। খাজা নাজিমুদ্দিনের শাসনামলে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করে।
খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে ভাষার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি। বরং ভাষা আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনাস্থা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশেও রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছিল। ১৯৫৩ সালে পাঞ্জাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সহিংসতা ও দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। লাহোরে সামরিক আইন জারি করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা বাড়ে।
অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা, মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তাঁর সরকারকে দুর্বল করে দেয়। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে পাকিস্তান। এসব পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদ খাজা নাজিমুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করেন। নাজিমুদ্দিন পদত্যাগে রাজি না হলেও গভর্নর জেনারেল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকার ভেঙে দেন। পরে মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। এ ঘটনায় পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের ওপর গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর খাজা নাজিমুদ্দিন আর আগের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারেননি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর ৭০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকায় তিন নেতার মাজারে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
তাঁর স্মৃতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের নামের মধ্যেও রয়েছে। পাকিস্তানের করাচিতে নাজিমাবাদ ও উত্তর নাজিমাবাদ এবং ঢাকা ও ইসলামাবাদের নাজিমুদ্দিন রোড তাঁর নাম বহন করছে। তাঁর সম্মানে পাকিস্তানের ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে।
খাজা নাজিমুদ্দিনের রাজনৈতিক জীবন ছিল সাফল্য, বিতর্ক ও ঐতিহাসিক সংকটের এক জটিল অধ্যায়। ব্রিটিশ ভারতের প্রাদেশিক রাজনীতি থেকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের পরিচায়ক। অন্যদিকে ভাষা আন্দোলন, প্রাদেশিক বৈষম্য, প্রশাসনিক সংকট এবং ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা তাঁকে উপমহাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর শাসনামলের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ইতিহাস বুঝতে আজও গুরুত্বপূর্ণ।