একটি কবিতা। কয়েকটি আগুনঝরা পঙ্ক্তি। অথচ সেই শব্দের আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অহংকার। যে সাম্রাজ্যের ক্ষমতার সামনে অসংখ্য মানুষ নীরবে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন এক তরুণ কবি। তাঁর হাতে ছিল না বন্দুক, ছিল না কোনো সৈন্যবাহিনী। ছিল শুধু শব্দ, সত্য উচ্চারণের সাহস আর শৃঙ্খল ভাঙার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। সেই অস্ত্রেই তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শাসকদের। কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। আর যে কবিতা তাঁকে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে নিয়ে গিয়েছিল, তার নাম ‘আনন্দময়ীর আগমনে’।
নজরুলের কাছে কবিতা কেবল সৌন্দর্যের আরাধনা ছিল না; ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথ। মানুষের কান্না, পরাধীনতার গ্লানি, শাসকের নিষ্ঠুরতা আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে উঠেছিল। তাই তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি কখনো হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের মশাল, কখনো নিপীড়িত মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের ভাষা। ব্রিটিশ সরকার হয়তো কবির শরীরকে কারাগারের দেয়ালে আটকে রাখতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার স্বপ্নকে বন্দি করতে পারেনি।
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর। অবিভক্ত বাংলায় দুর্গাপূজার আবহ। এমন এক সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। দুর্গাদেবীর আগমনকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও কবিতাটির অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল আরও গভীর। দেবী এখানে কেবল পূজামণ্ডপের প্রতিমা নন; তিনি অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা শক্তির প্রতীক।
নজরুল যেন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন পরাধীন জাতির বিবেকের সামনে কত দিন আর অত্যাচার সহ্য করবে মানুষ? কত দিন অন্যায়ের সামনে নতজানু হয়ে থাকবে? দেবী যদি অসুর বিনাশের প্রতীক হন, তবে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে তাঁর আবির্ভাব কোথায়?
কবিতায় ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতা, রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর নির্যাতন, বিপ্লবীদের ফাঁসি এবং পরাধীন মানুষের দুর্দশা উঠে আসে তীব্র ভাষায়। ধর্মীয় অনুষঙ্গকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের শক্তিতে রূপান্তর করে নজরুল এমন এক বার্তা দিয়েছিলেন, যা ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে ছিল অস্বস্তিকর ও বিপজ্জনক।
কবির সেই প্রতিবাদী উচ্চারণের একটি অংশ
“আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল? স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল।”
এই পঙ্ক্তিগুলোতে ছিল কেবল দেবীর প্রতি আহ্বান নয়, বরং ঘুমিয়ে থাকা মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা। নজরুলের কবিতায় দেবীর শক্তি যেন হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধের শক্তি। তাঁর আহ্বান ছিল অত্যাচার যখন মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, তখন নীরবতা আর নিরপেক্ষতা কোনো সমাধান হতে পারে না।
ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল, বন্দুকের গুলি দিয়ে মানুষের শরীর ক্ষতবিক্ষত করা যায়, কিন্তু একটি কবিতা মানুষের মনে যে আগুন জ্বালাতে পারে, তা নেভানো সহজ নয়। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার প্রকাশের পর সরকার ‘ধূমকেতু’র ওই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
তখন নজরুল কলকাতায় ছিলেন না। তিনি অবস্থান করছিলেন তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লায়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি জেলা। ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার ঝাউতলার মোড় থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়।
একজন কবির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা! যে মানুষটি শব্দের মধ্য দিয়ে পরাধীন মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁকেই রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী করা হলো। কিন্তু নজরুলের কাছে এই গ্রেপ্তার ছিল না পরাজয়। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছিল।
তাঁর ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’র মতো গ্রন্থও বিভিন্ন সময়ে ঔপনিবেশিক সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, নজরুলের সাহিত্যকে শাসকেরা নিছক সাহিত্য হিসেবে দেখেনি; তারা এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলার শক্তি।
কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুরু হয় নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলার বিচার। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি আদালতে লিখিত জবানবন্দি পাঠ করেন তিনি। ইতিহাসে এই বক্তব্য ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অমর হয়ে আছে।
কবির সেই জবানবন্দি ছিল কেবল নিজের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থন নয়; ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও বিচারব্যবস্থার সামনে সত্যের পক্ষে এক নির্ভীক ঘোষণা। তিনি বলেন
“আমার ওপর অভিযোগ আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।”
এই বক্তব্যে নজরুল নিজের কবিসত্তার পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি সত্য উচ্চারণের অধিকারকেও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে শাসকের আইন আর ন্যায়বিচার এক বিষয় ছিল না। ক্ষমতার চোখে যে বক্তব্য অপরাধ, সত্যের বিচারে সেটিই হতে পারে ন্যায়সংগত।
১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি বিচারক সুইনহো তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। নজরুলকে প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে এবং পরে হুগলি জেলে পাঠানো হয়।
কিন্তু কারাগারের দরজা বন্ধ করে দিলেই কি একজন বিদ্রোহী কবির কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায়? নজরুলের জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর হয়ে উঠেছিল।
কারাগারে বন্দীদের প্রতি বৈষম্য ও অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল আরও একবার সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের দিনে, হুগলি জেলে তিনি অনশন শুরু করেন। তাঁর দাবি ছিল বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
দিন গড়াতে থাকে। অনশন দীর্ঘ হয়। ক্রমে অবনতির দিকে যেতে থাকে কবির শারীরিক অবস্থা। কিন্তু প্রতিবাদের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অনড়। যে মানুষটি কবিতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন, কারাগারেও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।
নজরুলের অনশন শুধু একজন বন্দীর ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক কারাব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক নৈতিক অবস্থান। কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে তাঁর অনশনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়।
কবির জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন
“Give up hunger strike, our literature claims you.”
অর্থাৎ, অনশন ত্যাগ করো; আমাদের সাহিত্য তোমাকে দাবি করে।
কিন্তু নজরুলকে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করায় টেলিগ্রামটি তাঁর হাতে পৌঁছায়নি বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়। একদিকে কারাগারে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে অবতীর্ণ বিদ্রোহী কবি, অন্যদিকে তাঁর জীবন রক্ষার আকুল আবেদন জানানো আরেক মহাকবি। দুজনের পথ ও প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁদের একই মানবিক বন্ধনে যুক্ত করেছিল।
এর আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্পর্ক আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যিকারের সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে যুক্ত করে, বিভেদের দেয়াল ভেঙে দেয়।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পর্কে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক মজিদ মাহমুদ বাসসকে বলেন, এই কবিতা লেখার দায়ে নজরুলের কারাদণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুলের কারাবরণ ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শক্তির ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। কবিকে কারাগারে নেওয়া যায়, কিন্তু তাঁর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বন্দি করা যায় না।
মজিদ মাহমুদের বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই নজরুলের সাহিত্য ও জীবনকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর কবিতা, সম্পাদকীয়, রাজনৈতিক অবস্থান এবং কারাগারের অনশন সবকিছুর মধ্যেই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই দৃঢ়তা।
প্রায় ৪০ দিন অনশনের পরও নজরুলের সংগ্রামী সত্তা দমে যায়নি। অবশেষে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান তিনি। কারাগারের দরজা তাঁর জন্য খুলে গিয়েছিল; কিন্তু তার অনেক আগেই তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের হৃদয়ে।
নজরুলের জীবনের এই অধ্যায় আমাদের সামনে এক অনিবার্য সত্য তুলে ধরে শাসক ক্ষমতা দিয়ে মানুষের শরীরকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু আদর্শকে নয়। কারাগারের দেয়াল কবির পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু তাঁর উচ্চারণের পথ রুদ্ধ করতে পারে না।
আজও যখন মানুষ শোষণ, বৈষম্য, অন্যায় ও নিপীড়নের মুখোমুখি হয়, তখন নজরুলের কবিতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষোভ ছিল না; তা ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর দ্রোহ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে।
তাই ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শুধু একটি কবিতার নাম নয়; এটি বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। যে কবিতার জন্য কবিকে কারাগারে যেতে হয়েছিল, সেই কবিতাই তাঁকে ইতিহাসে আরও উজ্জ্বল করে রেখেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের শিখিয়েছেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি কলম, একটি কবিতা কিংবা নির্ভীক একটি বাক্যও হয়ে উঠতে পারে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।
ব্রিটিশ শাসন আজ ইতিহাস। কিন্তু মানুষের ওপর অত্যাচার, অধিকার হরণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। যত দিন মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা থাকবে, যত দিন ন্যায়বিচারের জন্য মানুষকে সংগ্রাম করতে হবে, তত দিন নজরুলের দ্রোহী চেতনা মানুষকে সাহস জোগাবে।
কারণ কবিকে কারাগারে পাঠানো যায়, তাঁর বই বাজেয়াপ্ত করা যায়, তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা করা যায় কিন্তু যে কবিতা মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে, তাকে বন্দি করা যায় না। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য সেই চিরন্তন সত্যেরই অমর সাক্ষ্য।