কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্ধকার দিক: মানুষের কর্মসংস্থান, চিন্তাশক্তি ও ভবিষ্যৎ কি হুমকির মুখে?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইএকুশ শতকের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অন্যতম বড় অর্জন। মুহূর্তের মধ্যে তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যার সমাধান, চিকিৎসায় রোগ শনাক্তকরণ, শিক্ষায় সহায়তা, শিল্প উৎপাদন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে তৈরি হচ্ছে কিছু গভীর উদ্বেগ। মানুষের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়া, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তার ওপর প্রভাব, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সব মিলিয়ে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা বাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার কথা, সেটিই যদি মানুষের কাজ, অধিকার, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে দুর্বল করে, তাহলে তার দায় কে নেবে? এআই নিজে কোনো নৈতিক সত্তা নয়; এটি মানুষের তৈরি প্রযুক্তি। তাই এর ক্ষতিকর ব্যবহার, ভুল সিদ্ধান্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে প্রযুক্তি নির্মাতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও ব্যবহারকারীদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট প্রযুক্তির সম্ভাবনা যত বড়, এর ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বেশি।

এআইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থানের ওপর চাপ। আগে যেসব কাজ করতে বহু মানুষের প্রয়োজন হতো, এখন সেসব কাজের কিছু অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে করা সম্ভব। সংবাদ লেখা, অনুবাদ, গ্রাহকসেবা, হিসাবরক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের নকশা এবং প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণার মতো কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে, কিন্তু কর্মীদের একটি অংশের কাজের ধরন বদলে যাওয়ার পাশাপাশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০২৫ সালের ২০ মে প্রকাশিত Generative AI and Jobs: A 2025 Update গবেষণায় জানিয়েছে, বিশ্বের প্রতি চারজন কর্মীর প্রায় একজন এমন পেশায় নিয়োজিত, যেখানে উৎপাদক এআইয়ের প্রভাব পড়তে পারে। তবে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো পেশা বিলুপ্ত হওয়ার পরিবর্তে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অর্থাৎ, এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি চাকরি হারানোর হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

“উৎপাদক এআইয়ের প্রভাবে অধিকাংশ পেশা পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার পরিবর্তে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”

            আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ২০২৫ সালের গবেষণা।

এখানে উদ্বেগের বিষয় শুধু চাকরি হারানো নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সবার সমান না থাকা। একজন দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী এআই ব্যবহার করে নিজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারেন। অন্যদিকে, ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত একজন কর্মী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে তরুণ, স্বল্পদক্ষ কর্মী এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণবঞ্চিত মানুষের জন্য এই পরিবর্তন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এআইয়ের সুবিধা যদি মূলত বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও পুঁজির মালিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, অথচ কর্মীদের আয় ও নিরাপত্তা একই হারে না বাড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বাড়লেই যে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জীবনমান বাড়বে, তার নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, সংবাদমাধ্যম, বিপণন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রাহকসেবার কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর সুযোগ না থাকলে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন অনেক পরিবারের আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এ কারণে এআইকে কেবল চাকরি কমানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি এর প্রভাবে কর্মসংস্থানে কোনো ঝুঁকি নেই এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

এআইয়ের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো মিথ্যা তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা। এখন কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও, কণ্ঠস্বর ও লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে এমন ঘটনা উপস্থাপন করা সম্ভব, যা বাস্তবে ঘটেনি। কারও মুখ ব্যবহার করে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি, পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠ নকল করে অর্থ আদায় কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সুনাম নষ্ট করা এসব অপব্যবহারের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।

২০২৫ সালের International AI Safety Report সাধারণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থার ঝুঁকিকে তিনটি প্রধান ভাগে চিহ্নিত করেছে: ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার, ব্যবস্থার ত্রুটি এবং বৃহত্তর সামাজিক বা কাঠামোগত ঝুঁকি। প্রতিবেদনে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি, কণ্ঠস্বর নকল করে আর্থিক প্রতারণা, ব্ল্যাকমেল এবং ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার মতো ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

            গবেষকদের পর্যবেক্ষণের মূল কথা

“এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট এখন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রতারণা, হয়রানি ও সুনামহানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

            International AI Safety Report 2025-এর ঝুঁকি মূল্যায়নের সারমর্ম।

এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, একটি মিথ্যা তথ্য তৈরি করার পর সেটি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। রাজনৈতিক বিভ্রান্তি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, আর্থিক গুজব কিংবা জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য ছড়াতে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলে তার পরিণতি ব্যক্তি থেকে শুরু করে পুরো সমাজের ওপর পড়তে পারে।

সংবাদমাধ্যমের জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো ভিডিও বা অডিও দেখে সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আবার প্রকৃত ছবি বা ভিডিওকেও কেউ এআই দিয়ে তৈরি বলে অস্বীকার করতে পারে। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে।

এআইয়ের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে তথ্যের ওপর। মানুষের ছবি, কণ্ঠস্বর, অবস্থান, অনলাইন আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ব্যবস্থা কাজ করতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, কোথায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় স্পষ্ট থাকে না।

ব্যক্তিগত তথ্যের অননুমোদিত ব্যবহার হলে পরিচয় চুরি, আর্থিক প্রতারণা, অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়ে। মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যবহৃত হলে মানুষের চলাফেরা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এআই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মধ্যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সম্মতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের মূল ভাব হলো, মানুষের তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তথ্য সংগ্রহে সম্মতি দেওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে কি না এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

“ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং সম্মতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”

          এআই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের পিউ রিসার্চ সেন্টার-প্রকাশিত বক্তব্যের সারমর্ম।

বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, নিরাপদ সংরক্ষণ, অনুমতিবিহীন ব্যবহার প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এআইয়ের উত্তর সব সময় সঠিক হয় না। অনেক সময় এটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেয়, অস্তিত্বহীন সূত্র উল্লেখ করে কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করে। এ ধরনের ভুলকে সাধারণভাবে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়। চিকিৎসা, আইন, আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা সংবাদ প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যাচাই ছাড়া এআইয়ের ফলাফল গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিজ অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের ২০২৫ সালের Artificial Intelligence and the Future of Work প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান এআই ব্যবস্থায় ভুল উত্তর, পক্ষপাতপূর্ণ আচরণ এবং প্রদত্ত তথ্য থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

“এআই ব্যবস্থা ভুল তথ্য দিতে পারে, পক্ষপাত দেখাতে পারে এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হতে পারে।”

            যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিজের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন।

সমস্যা আরও গভীর হয় যখন মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধির পরিবর্তে এআইয়ের উত্তরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা যদি নিজে চিন্তা না করে তৈরি করা উত্তর জমা দেয়, কর্মীরা যদি যাচাই ছাড়াই প্রতিবেদন তৈরি করেন কিংবা গবেষকেরা যদি এআইয়ের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত মনে করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০২৬ সালে Hastings Center Report-এ প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক নিবন্ধেও গবেষণায় এআই এজেন্ট ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষকদের কাজ হারানো, দক্ষতার অবক্ষয়, ভুল বা পক্ষপাতপূর্ণ ফলাফলের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ এবং গবেষণার দায় নির্ধারণে জটিলতার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করলেও মানুষের শেখা, যাচাই করা ও প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা যেন দুর্বল না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এআইয়ের আরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে, যেগুলোর মাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। উন্নত এআই ব্যবস্থার সাহায্যে সাইবার হামলা আরও কার্যকর করা, বিপজ্জনক প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ সহজ করা কিংবা স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে ভবিষ্যতে এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এমন পরিণতিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, বিপজ্জনক অপব্যবহার এবং এআই ব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বড় এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা, বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। তথ্যকেন্দ্রের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের সময় শুধু প্রযুক্তির সুবিধা নয়, এর জ্বালানি ব্যবহার ও সম্পদ ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করা যাবে। এ জন্য এআই দিয়ে তৈরি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তকরণ, কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দায় নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

২০২৬ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামো ছাড়া এআইয়ের ঝুঁকি এর সুফলকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল শিক্ষা হলো, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্যও এখনই এআই ব্যবহারের নীতিমালা, তথ্য সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষায় প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমে এআইয়ের সাহায্যে তৈরি তথ্য প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই, ব্যক্তির সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভুল হলে সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির সাফল্য শুধু কত দ্রুত কাজ করা যায়, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হবে, সেই প্রযুক্তি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করছে কি না, বৈষম্য কমাচ্ছে কি না এবং সমাজকে আরও নিরাপদ করছে কি না। এআই মানুষের সহায়ক হবে, নাকি মানুষকে নিজের তৈরি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলবে তার উত্তর নির্ভর করছে প্রযুক্তির চেয়ে বেশি মানুষের সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ওপর।

এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী হবে, তা নয়; বরং সেই শক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং তার সুফল ও ক্ষতির দায় কে বহন করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ