প্রতিদিনের জীবনে আমরা অসংখ্য তথ্য ও সংখ্যার মুখোমুখি হই। চাল-ডালের দাম থেকে শুরু করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শিক্ষার হার, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবকিছু বুঝতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান। একটি দেশের বর্তমান অবস্থা জানা, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা এবং উন্নয়নের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে পরিসংখ্যানের ভূমিকা অপরিসীম। তাই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা বা হিসাবের সমষ্টি নয়; এটি বাস্তবতাকে বোঝার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এই গুরুত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই পালিত হয় বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস।
জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ২০ অক্টোবর বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালিত হয়। প্রথম বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস উদ্যাপিত হয় ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর। পরিসংখ্যানের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিসংখ্যানব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ জোগানো এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান কমিশন বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। প্রথমবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিসংখ্যানকে উন্নয়ন, সুশাসন ও নীতিনির্ধারণের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়।
২০১০ সালে প্রথম বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের আয়োজনের সময় বিশ্বের ১০৩টি দেশ জাতীয় পর্যায়ে পরিসংখ্যান দিবস পালন করে। এর মধ্যে আফ্রিকার ৫১টি দেশ প্রতি বছর ১৮ নভেম্বর আফ্রিকান পরিসংখ্যান দিবস উদ্যাপন করে থাকে। ভারতে পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশের জন্মদিন ২৯ জুন জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস হিসেবে পালিত হয়। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যানের ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সংখ্যাভিত্তিক তথ্য বোঝার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসে ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের রয়্যাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি ‘গেটস্ট্যাটস’ নামে একটি পরিসংখ্যানবিষয়ক সাক্ষরতা অভিযান চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল মানুষকে পরিসংখ্যানের অর্থ বুঝতে, তথ্যের যথার্থতা যাচাই করতে এবং দৈনন্দিন জীবনে সংখ্যাভিত্তিক তথ্যের সঠিক ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা। কারণ, তথ্যের সংখ্যা যত বাড়ছে, সেই তথ্যের তাৎপর্য বোঝা এবং বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা থেকে সতর্ক থাকা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। একটি দেশে কত মানুষ বসবাস করে, তাদের মধ্যে কতজন কর্মক্ষম, কতজন বেকার, কত শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে কিংবা কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা কঠিন। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে। কোন অঞ্চলে হাসপাতাল প্রয়োজন, কোথায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে, কোন এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম কিংবা কোথায় কৃষকদের সহায়তা বাড়ানো জরুরি এসব সিদ্ধান্তেও পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিসংখ্যানের গুরুত্ব আরও ব্যাপক। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান নিরূপণে নির্ভরযোগ্য তথ্যের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জনশুমারি, কৃষিশুমারি, অর্থনৈতিক শুমারি, শ্রমশক্তি জরিপ, পরিবার আয়-ব্যয় জরিপসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারকেরা দেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজনীয় উপাত্ত ব্যবহার করতে পারেন।
তবে পরিসংখ্যানের কার্যকারিতা নির্ভর করে তথ্যের মান, সংগ্রহপদ্ধতি, নিরপেক্ষতা এবং প্রকাশের স্বচ্ছতার ওপর। তথ্য যদি অসম্পূর্ণ, পুরোনো, ভুল কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে তার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো এলাকায় বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে উঠে না এলে সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্প গ্রহণে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আবার কৃষি উৎপাদন, খাদ্যচাহিদা কিংবা বাজারদরের তথ্য যথাযথ না হলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই পরিসংখ্যান সংগ্রহের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, নিয়মিত হালনাগাদ এবং জনসাধারণের কাছে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিকাশ পরিসংখ্যানের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৃহৎ তথ্যভান্ডার, উপগ্রহচিত্র এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এখন অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি নিরূপণ, রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্ধারণ এবং শিল্পের বাজার বিশ্লেষণে এসব তথ্য কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্যের অপব্যবহার এবং অ্যালগরিদমের পক্ষপাতের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নির্ভুল তথ্যের পাশাপাশি তথ্য ব্যবহারে নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পরিসংখ্যানের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কও অত্যন্ত নিবিড়। মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈদেশিক বাণিজ্য, সরকারি ব্যয় কিংবা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেই তার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বোঝা যায় না। তথ্যটি কোন সময়ের, কী পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা হয়েছে, আগের সময়ের তুলনায় পরিবর্তন কতটা এবং এর পেছনে কী কারণ রয়েছে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো একটি সংখ্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে তথ্যের উৎস যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে তুলনা এবং পরিসংখ্যানের যথাযথ ব্যাখ্যা অপরিহার্য।
বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিসংখ্যান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। শুধু গবেষক, অর্থনীতিবিদ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নয়, প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই তথ্য বোঝার সক্ষমতা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য পরিসংখ্যান, জরিপ ও চিত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এসব তথ্যের সবই যে নির্ভুল, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো তথ্যকে নতুন বলে প্রচার করা হয়, আবার কখনো নমুনা জরিপের সীমিত ফলাফলকে পুরো দেশের মানুষের মতামত হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাই কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন জরিপের নমুনা যথেষ্ট এবং কোন সংখ্যার ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর এসব বুঝতে পরিসংখ্যান বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম। দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অগ্রগতি পরিমাপ করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। শুধু উন্নয়নের ঘোষণা দিলেই অগ্রগতি নিশ্চিত হয় না; সেই উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে, কোন জনগোষ্ঠী পিছিয়ে রয়েছে এবং কোথায় আরও উদ্যোগ প্রয়োজন, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের পরিস্থিতি আলাদাভাবে পরিমাপ করা হলে উন্নয়নের বৈষম্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। জাতিসংঘও নির্ভরযোগ্য, সময়োপযোগী ও সবার জন্য সহজলভ্য তথ্যকে কার্যকর নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে তথ্য সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিসংখ্যান প্রকাশে নিয়মিততা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি তথ্যের পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার গবেষণালব্ধ তথ্যও যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে কাজে লাগানো যেতে পারে। তথ্যের অসংগতি দেখা দিলে তার কারণ ব্যাখ্যা করা এবং সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা প্রকাশ করা উচিত। এতে পরিসংখ্যানের ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বুঝতে শুধু বড় বড় প্রকল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান জানাই যথেষ্ট নয়। সেই অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে কি না, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমেছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে। পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের বাস্তব জীবনকে তুলে ধরে এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পালিত এই আন্তর্জাতিক দিবস তাই শুধু পরিসংখ্যানবিদদের কাজের স্বীকৃতি জানানোর উপলক্ষ নয়; এটি নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। সঠিক তথ্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, আর সঠিক সিদ্ধান্তই পারে উন্নয়নকে টেকসই ও জনকল্যাণমুখী করতে। তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত সততা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের কাছে তথ্য সহজলভ্য করার প্রচেষ্টা যত জোরদার হবে, ততই গড়ে উঠবে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও সচেতন সমাজ। সংখ্যার আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে চেনা এবং সেই বাস্তবতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের মধ্যেই বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।