‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কত সহজ একটি বাণী, অথচ তার গভীরে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন, আত্মপরিচয় আর মানবতার এক বিশাল দর্শন। শত বছর পেরিয়ে আজও এই বাণী মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। মনের গভীরে প্রশ্ন জাগায় আমরা কি সত্যিই মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি? ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত আর সামাজিক পরিচয়ের দেয়াল পেরিয়ে আমরা কি কখনো মানুষের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে পেরেছি? নাকি বাহ্যিক পরিচয়ের মোহে হারিয়ে ফেলেছি নিজেরই মানবিক সত্তা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় বাংলার মরমি সাধক ফকির লালন শাহের কাছে। ফিরে আসতে হয় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার সেই আখড়াবাড়িতে, যেখানে মাটির গন্ধে, বাতাসের স্পর্শে আর একতারার মায়াবী সুরে আজও যেন বেঁচে আছেন মানবতার এই সাধক। তাঁর গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে আছে মানুষকে ভালোবাসার আহ্বান, ভেদাভেদ ভুলে কাছে আসার আকুতি আর নিজের ভেতরে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার নিরন্তর সাধনা।
লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব। ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবরের এই আয়োজন ঘিরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন বাউল-সাধক, ভক্ত, শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। কারও হাতে একতারা, কারও কণ্ঠে প্রিয় সাধকের গান, আবার কারও চোখেমুখে প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করার এক অদ্ভুত আবেগ। কেউ এসেছেন গানের টানে, কেউ দর্শনের সন্ধানে, কেউবা শুধু একবার অনুভব করতে চান সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশ, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বিভেদের দেয়াল থাকার কথা নয়।
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তাই এ শুধু উৎসব নয়, এ যেন হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলনমেলা। এখানে পরিচয়ের চেয়ে অনুভূতি বড়, আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আত্মিক টান গভীর। গানের সুরে সুরে মানুষ খুঁজে ফেরে নিজের অস্তিত্ব, জীবনের অর্থ আর বেঁচে থাকার অন্তর্নিহিত সত্য।
লালনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর প্রশ্ন করার সাহস। যে সমাজ মানুষকে ধর্মের পরিচয়ে আলাদা করে, জাতের নামে ছোট-বড় করে, জন্মের পরিচয় দিয়ে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করতে চায়, সেই সমাজের প্রচলিত চিন্তাকে তিনি প্রশ্ন করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কী? জন্মের পর সমাজ যে পরিচয়ের পোশাক পরিয়ে দেয়, সেটিই কি মানুষের আসল পরিচয়? মানুষের শরীর, মন আর আত্মার গভীরে যে মানবিক সত্তা লুকিয়ে আছে, তাকে না চিনে কেবল বাহ্যিক পরিচয় নিয়ে এত অহংকার কেন?
লালনের দর্শনে মানুষ কোনো বিভাজনের নাম নয়। মানুষ মানে ভালোবাসা, অনুভব, সহমর্মিতা আর আত্মোপলব্ধি। তাঁর গানে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতা, জাতপাতের অহংকার এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে গভীর প্রশ্ন উঠে এসেছে, তা আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ, সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন; কিন্তু মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির প্রবণতা এখনো শেষ হয়নি।
আজও মানুষ ধর্মের নামে মানুষকে ঘৃণা করে, বর্ণের পরিচয়ে কাউকে দূরে ঠেলে দেয়, অর্থসম্পদের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে। কখনো রাজনৈতিক বিভাজন, কখনো সামাজিক বিদ্বেষ, কখনো ব্যক্তিগত অহংকার মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়িয়ে তোলে। এমন এক সময়ে লালনের গান যেন নীরবে প্রশ্ন করে মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে এত পরিচয়, এত অহংকার, এত আয়োজনের অর্থ কী?
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির পরিবেশে লালনের গান কেবল শোনা যায় না, অনুভবও করা যায়। একতারা, দোতারা আর খমকের সুর যখন বাতাসে ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়, এই সুরের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার মাটি, নদী, গ্রাম আর মানুষের হাজার বছরের জীবনকথা। গানের প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ের কোনো গোপন দরজায় কড়া নাড়ে। পরিচিত পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শেখায়।
লালনের গান শুনতে শুনতে কখনো মনে হয়, তিনি আমাদের জীবনের কথাই বলে যাচ্ছেন। যে দুঃখ আমরা কাউকে বলতে পারি না, যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না, যে শূন্যতা প্রতিদিনের ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে রাখি তাঁর গানের ভেতর যেন তারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এ কারণেই লালনের গান শুধু বাউল-সাধকদের সম্পদ নয়, তা সাধারণ মানুষেরও আত্মার আশ্রয়।
তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবনার গভীরতা অসীম। জীবনের জটিল দার্শনিক প্রশ্ন তিনি তুলে ধরেছেন গ্রামবাংলার পরিচিত শব্দ, উপমা ও রূপকের সাহায্যে। ফলে তাঁর গান একদিকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, অন্যদিকে গবেষক ও চিন্তাবিদদের কাছে হয়ে উঠেছে নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়।
স্মরণোৎসবের আসরে যখন কোনো শিল্পী লালনের গান ধরেন, তখন শ্রোতারা শুধু সুরের মুগ্ধতায় ডুবে থাকেন না; গানের কথার সঙ্গে নিজেদের জীবনের হিসাবও মেলাতে থাকেন। কারও চোখে জমে ওঠে জল, কারও মনে জেগে ওঠে পুরোনো স্মৃতি, আবার কেউ নীরবে ভাবতে থাকেন নিজের জীবন ও বিশ্বাস নিয়ে। এই যে গান শুনতে শুনতে নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া, নিজের ভুল, অহংকার ও সীমাবদ্ধতাকে চিনতে শেখা এটাই যেন লালনসাধনার অন্যতম সৌন্দর্য।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রাম লালন শাহের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এখানকার আখড়াবাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, বাংলার মরমি সাধনা ও লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। বছরের পর বছর ধরে এই আঙিনায় সমবেত হয়েছেন লালনভক্তরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গানের সুরে তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন এক সাধকের জীবনদর্শন।
তিরোধান দিবস এলেই ছেঁউড়িয়া যেন অন্য এক রূপ ধারণ করে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। কেউ দল বেঁধে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউবা একাকী। অনেকের কাছে এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়, একধরনের আত্মিক টান। শহরের ব্যস্ততা, জীবনের হিসাব-নিকাশ আর প্রতিদিনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে তাঁরা কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় খোঁজেন গানের মধ্যে, সাধনার মধ্যে, মানুষের মিলনমেলায়।
বাউল-সাধকদের কাছে লালন কেবল একজন প্রয়াত সাধক নন; তিনি তাঁদের জীবনদর্শনের অংশ, তাঁদের বিশ্বাস ও সাধনার অনুপ্রেরণা। তাঁর গান তাঁদের কাছে পথচলার সঙ্গী। সেই গানে তাঁরা খুঁজে পান জীবনের অর্থ, মনের শান্তি আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা।
আখড়াবাড়ির এই মিলনমেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির শক্তি মানুষের হৃদয়কে এক করতে পারে। ভাষা, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয় আলাদা হলেও গানের সামনে মানুষ এক হয়ে যেতে পারে। একটি সুর কখনো কখনো এমন দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়, যা দীর্ঘদিনের কথাবার্তাতেও সম্ভব হয় না।
লালন শাহের জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যের পাশাপাশি নানা লোককথা ও জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। তাঁর জন্মপরিচয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায় এবং সাধনাপথ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে সব প্রচলিত কাহিনিকে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর গান, মানবতাবাদী চিন্তা এবং সমাজের প্রচলিত বিভাজনকে প্রশ্ন করার সাহসই তাঁকে বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু একজন সাধকের শারীরিক প্রস্থান যে তাঁর দর্শনের সমাপ্তি নয়, লালন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি চলে গেছেন, অথচ তাঁর গান থেকে গেছে। তাঁর কণ্ঠ থেমেছে, কিন্তু তাঁর বাণী থামেনি। তাঁর শরীর মাটিতে মিশে গেছে, কিন্তু তাঁর ভাবনা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার গ্রাম থেকে শহরে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।
মৌখিক পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়া তাঁর গান আজ বাংলার লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। সংগীতশিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর সৃষ্টি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর গান নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, মঞ্চে পরিবেশিত হচ্ছে, নতুন সংগীতায়োজনেও ফিরে আসছে। তবে এই চর্চার পাশাপাশি গানের নির্ভরযোগ্য পাঠ সংরক্ষণ, প্রামাণ্য সংগীত সংগ্রহ তৈরি এবং বাউল-সাধকদের জীবন ও সাধনা নিয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
কারণ, লালনকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ শুধু তাঁর গান গাওয়া নয়; তাঁর দর্শনকে বুঝতে শেখা। তাঁর নামে উৎসব আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়, তাঁর মানবিক মূল্যবোধকে সম্মান করাও প্রয়োজন। যাঁরা তাঁর গানকে জীবনের অংশ করে নিয়েছেন, সেই বাউল-সাধকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জীবনমানের প্রতিও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে লালন স্মরণে নানা আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা, সংগীতানুষ্ঠান ও স্মরণপর্বের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে এই মরমি সাধককে। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; নতুন প্রজন্মের সামনে লালনের চিন্তা, বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনা তুলে ধরাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
জাতীয় পর্যায়ে লালন স্মরণকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ তাঁর দর্শন নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন উৎসবের মঞ্চে উচ্চারিত মানবতার বাণী আমাদের দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিফলিত হবে।
আমরা যদি গানের আসরে দাঁড়িয়ে মানুষের সমতার কথা বলি, অথচ বাস্তব জীবনে মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করি, তাহলে লালনকে স্মরণ করার তাৎপর্য কোথায়? আমরা যদি তাঁর গান গেয়ে মুগ্ধ হই, কিন্তু বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন আমাদের জীবনে কতটা জায়গা পেল?
লালনের দর্শন আমাদের কাছে এমনই কিছু কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়। এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল কথায় দেওয়া যায় না; উত্তর দিতে হয় কাজে, আচরণে এবং অন্য মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আজকের পৃথিবীতে অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ, যুদ্ধ, সংঘাত ও বৈষম্য মানুষের জীবনকে ক্রমাগত কঠিন করে তুলছে। মানুষ প্রযুক্তিতে এগিয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে, পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। অথচ মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে কমেনি। কোথাও ধর্মের নামে সংঘাত, কোথাও জাতিগত বিদ্বেষ, কোথাও সম্পদের বৈষম্য মানুষের মনুষ্যত্ব আজও নানা পরীক্ষার মুখে।
এই পৃথিবীতে লালনের গান তাই কেবল বাংলার লোকসংগীতের ঐতিহ্য নয়, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক অনন্ত আহ্বান। তাঁর দর্শন শেখায়, অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করা যায় না। ঘৃণা দিয়ে ভালোবাসা জন্মানো যায় না। বিভেদ তৈরি করে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মানুষকে বুঝতে হলে তার বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার হৃদয়ের দিকে তাকাতে হয়।
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনের স্মরণোৎসব শেষ হবে। ভক্তরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। মঞ্চের আলো নিভে যাবে, গানের আসর ভাঙবে, মানুষের কোলাহল ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু একতারার সুর কি সত্যিই থেমে যাবে? লালনের বাণী কি আখড়াবাড়ির সীমানার মধ্যেই আটকে থাকবে? নিশ্চয়ই নয়। সেই সুর ফিরে যাবে মানুষের ঘরে, পথে, জীবনের নানা বাঁকে। কারও মনে জাগাবে ভালোবাসা, কারও মনে প্রশ্ন, কারও জীবনে হয়তো বদলে দেবে অন্য মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
ছেঁউড়িয়ার আকাশে যখন একতারার সুর ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়, বাংলার মাটিতে আজও কেউ একজন মানুষকে খুঁজে ফিরছেন। তিনি খুঁজছেন সেই মানুষকে, যে অন্যের দুঃখে কষ্ট পায়, অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকেও আপন করে নিতে জানে। যে মানুষ পরিচয়ের অহংকারে অন্ধ নয়, ভালোবাসার শক্তিতে উদার।
লালন শাহ আজ আর আমাদের সামনে এসে গান ধরবেন না। তাঁর কণ্ঠে আর নতুন কোনো সুর উঠবে না। কিন্তু তাঁর গান আছে, তাঁর বাণী আছে, তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো আছে। সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরই নিজেদের চিনতে হবে।
হয়তো লালনকে খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ তাঁর সমাধির সামনে দাঁড়ানো নয়, তাঁর গান মুখস্থ করাও নয়। বরং প্রতিদিনের জীবনে একজন মানুষকে সম্মান করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভিন্নমতের মানুষকে সহ্য করা এবং ঘৃণার বদলে ভালোবাসাকে বেছে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার সত্যিকারের অর্থ।
সময় বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, পৃথিবীর রূপও পাল্টে যাবে। তবু মানুষের ভেতরে মানুষকে খুঁজে ফেরার আকুলতা কখনো শেষ হবে না। আর যত দিন মানুষ সেই মানুষকে খুঁজবে, তত দিন ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে লালনের গান বাজবে একতারার তারে, বাউলের কণ্ঠে, ভক্তের হৃদয়ে।
লালন তাই শুধু অতীতের কোনো সাধক নন; তিনি মানুষের কাছে মানুষ হয়ে ওঠার এক চিরন্তন আহ্বান। তাঁর বাণী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মনুষ্যত্ব, আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাধনা মানুষকে ভালোবাসতে শেখা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী