লালনের বাণীতে আজও খুঁজি মানুষ: ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সাধক-ভক্তদের মিলনমেলা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ মানবতাবাদী সাধক ফকির লালন শাহের দর্শনের মূল সুর যেন এই একটি বাণীতেই ধ্বনিত হয়। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য আর মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে তিনি খুঁজেছেন মানুষের ভেতরের মানুষকে। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষই ছিল তাঁর সাধনার কেন্দ্র, মানবতাই ছিল তাঁর দর্শনের প্রাণ। সেই চিরন্তন দর্শনকে ধারণ করে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব। মরমি সাধক ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমবেত হয়েছেন বাউল-সাধক, ভক্ত, শিল্পী, গবেষক ও দর্শনার্থীরা।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭ অক্টোবর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে লালন স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আলোচনা, সংগীতানুষ্ঠান ও স্মরণপর্ব। লালনের জীবন, সাধনা, মানবতাবাদী চিন্তা এবং বাংলা লোকসংস্কৃতিতে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা লালন শাহ শুধু একজন বাউল সাধক নন, তিনি বাংলা দর্শন, সংগীত ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রতীক। তাঁর গান মানুষের আত্মজিজ্ঞাসাকে জাগিয়ে তোলে, সমাজের প্রচলিত বিভাজনকে প্রশ্ন করে এবং মানুষকে নিজের ভেতরের সত্য অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। কয়েক শতাব্দীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যেও তাঁর গানের আবেদন ম্লান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দর্শন নতুন অর্থে ফিরে এসেছে মানুষের কাছে।

লালনের গান শুনতে গেলে কেবল সুরের মাধুর্যে মুগ্ধ হলে চলে না, এর অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করাও জরুরি। তাঁর গানে রয়েছে জীবন, মৃত্যু, আত্মপরিচয়, মানবপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজের প্রচলিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে গভীর প্রশ্ন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মানুষ আসলে কে? মানুষের প্রকৃত পরিচয় কোথায়? জন্মের পর সমাজ যে পরিচয়ের দেয়াল তৈরি করে, তা কি মানুষের সত্যিকারের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে? এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই লালন মানুষের অন্তর্জগতকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন।

লালনের দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা। ধর্মীয় পরিচয়, জাতপাত কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করার প্রবণতা তাঁর গানের নানা বক্তব্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাঁর ভাবনায় মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মূল্য অনেক বেশি। এ কারণেই লালন আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক সমাজ গঠনের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রাম লালনের স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এখানেই গড়ে উঠেছে তাঁর আখড়াবাড়ি, যা দীর্ঘদিন ধরে বাউল সাধনা, লোকসংগীত ও মানবতাবাদী চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তিরোধান দিবস ঘিরে প্রতিবছর আখড়াবাড়িতে ভক্তদের সমাগম ঘটে। একতারা, দোতারা ও খমকের সুরে লালনের গান ছড়িয়ে পড়ে আখড়ার পরিবেশে। কেউ গানের সুরে খুঁজে ফেরেন আত্মার মুক্তি, কেউ উপলব্ধি করতে চান গানের অন্তর্নিহিত দর্শন, আবার কেউ আসেন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে।

তিন দিনের স্মরণোৎসবের পরিবেশে তাই শুধু উৎসবের আনন্দ থাকে না, থাকে একধরনের আত্মিক অনুসন্ধানও। লালনভক্তদের কাছে এ আয়োজন নিছক কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; বরং সাধনা, স্মরণ ও ভাববিনিময়ের উপলক্ষ। নিজস্ব রীতি ও আচার অনুসরণ করে তাঁরা গানে গানে স্মরণ করেন তাঁদের প্রিয় সাধককে। গানের আসরে শিল্পী ও শ্রোতার ব্যবধান অনেক সময় যেন ঘুচে যায়। একজন শিল্পী যখন লালনের গান পরিবেশন করেন, তখন শ্রোতারাও সেই গানের ভাবের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখেন।

লালনের গানের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য তাঁকে অন্য অনেক সংগীতস্রষ্টার থেকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর গান একদিকে সহজ ভাষায় রচিত, অন্যদিকে এর অন্তর্নিহিত ভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে নেওয়া শব্দ, উপমা ও রূপকের মধ্য দিয়ে তিনি জটিল দার্শনিক প্রশ্নকে সহজভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর গান তাই গ্রামীণ মানুষের কাছে যেমন আপন, তেমনি শিক্ষিত সমাজের গবেষক ও চিন্তাবিদদের কাছেও অনুসন্ধানের বিষয়।

লালন শাহের জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যের পাশাপাশি নানা লোককথা ও জনশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। তাঁর জন্মপরিচয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায় এবং সাধনাপথ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে তাঁর জীবন সম্পর্কে সব তথ্য সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এসব বিতর্কের বাইরে তাঁর গান, দর্শন ও মানবিক অবস্থানই তাঁকে বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর গান ও দর্শনের চর্চা থেমে থাকেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাউল-সাধক, লোকসংগীতশিল্পী ও গবেষকেরা তাঁর সৃষ্টি সংরক্ষণ এবং প্রচারের কাজ করে আসছেন। মৌখিক পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়া তাঁর অনেক গান বাংলার লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণা হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে নানা গ্রন্থ ও প্রবন্ধ।

লালনের স্মরণোৎসবের গুরুত্ব কেবল অতীতের একজন সাধককে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ আয়োজন বাংলার লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, বাউলগানের চর্চা এবং নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও লালনের গান মানুষকে শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়। তাঁর গানের ভাষা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনকে বোঝার জন্য শুধু বাহ্যিক পরিচয় নয়, প্রয়োজন গভীর উপলব্ধি ও আত্মসমালোচনা।

তবে লালন স্মরণোৎসবকে অর্থবহ করে তুলতে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন যথেষ্ট নয়। তাঁর গান ও দর্শনের যথাযথ সংরক্ষণ, বাউল-সাধকদের জীবনমান উন্নয়ন, লোকসংগীতের ধারাবাহিক চর্চা এবং গবেষণার সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বাউলগানের মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রামাণ্য সংগীত সংগ্রহ তৈরি এবং লালনের গানের নির্ভরযোগ্য পাঠ সংরক্ষণের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাউলদের জীবনদর্শন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করার সামাজিক পরিবেশও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছর থেকে জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি উদযাপনের উদ্যোগ শুরু হয়। এর ফলে লালনের দর্শন ও সংগীতকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন তাঁর মানবতাবাদী শিক্ষা কেবল স্মরণোৎসবের মঞ্চে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হবে।

রাজধানীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় ‘লালন স্মরণানুষ্ঠান’ আয়োজনের কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে শিল্পী ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমীর মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা। সভাপতিত্ব করার কথা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সচিব ও মহাপরিচালক মোহা. হারুন-অর-রশীদের। আলোচনা শেষে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও রাখা হয়েছে।

ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনের এই আয়োজন ১৯ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও লালনের গান ও দর্শনের আবেদন শেষ হওয়ার নয়। তাঁর গানের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে রয়েছে নিজেকে জানার আহ্বান, অন্য মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা এবং বিভেদের দেয়াল ভেঙে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বার্তা।

আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা যখন মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে তুলছে, তখন লালনের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে মানুষকে আটকে রাখতে চাননি; বরং মানুষের ভেতরের সত্য ও মানবিক সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই শিক্ষা কেবল বাউলগানের বিষয় নয়, একটি সহনশীল ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা।

লালন শাহকে স্মরণ করার অর্থ তাই শুধু তাঁর গান গাওয়া কিংবা তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো নয়; তাঁর জীবনদর্শনের মর্ম উপলব্ধি করে তা নিজের জীবনে ধারণ করা। মানুষকে ভালোবাসা, অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং পরিচয়ের বিভাজন অতিক্রম করে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

ছেঁউড়িয়ার আকাশে যখন একতারার সুর ভেসে ওঠে, তখন সেই সুরে মিশে থাকে বাংলার মাটির ঘ্রাণ, মানুষের দীর্ঘদিনের সাধনা আর আত্মপরিচয় খোঁজার আকুলতা। লালনের গান মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় বাহ্যিক আড়ালে নয়, তার মনুষ্যত্বে। তাই সময় বদলালেও লালন হারিয়ে যান না। তাঁর গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তাঁর দর্শন নতুন প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আর তাঁর মানবতাবাদী বাণী আজও পথ দেখায় বিভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ