নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে বিরোধীরা

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণে বিরোধীদের উদ্যোগ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে নতুন করে সংসদে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিরোধী দলগুলো। একই সঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিল, বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহাল এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সংসদীয় উদ্যোগের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলন জোরদার হওয়ায় বিষয়টি ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে নতুন নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরোধী দলগুলো সংসদের দুই কক্ষেই নতুন করে প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা করেছে। এর আগে ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলে তাঁকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। ফলে নতুন উদ্যোগটি বিরোধীদের তৃতীয় দফার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে এবং যাঁদের নাম অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছে, তাঁদের ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন বলেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য তালিকাকে নির্ভুল করা। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপি বিরোধীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এখন নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সংঘাতেরও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে অক্টোবরের প্রথমার্ধে আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। ৬ অক্টোবর ইন্ডিয়া জোটের সংসদ সদস্যরা নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের দিকে মিছিল করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল। পরদিনও দিল্লিতে বিরোধীদের বিক্ষোভ হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়।

আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের একটি অংশও যুক্ত হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি যুব সংগঠন জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছিল। সংগঠনটি দেশজুড়ে আন্দোলনের হুমকিও দেয়। ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশের আগে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সমাবেশে শতাধিক নয়, বরং কয়েক শ মানুষ অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে বামপন্থী পাঁচটি দল ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। তাদের দাবির মধ্যে ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ, এসআইআর বন্ধ এবং যাঁদের নাম অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার। এ থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি কেবল কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিরোধীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। তবে এসব নামের সবই যে বৈধ ভোটারের, তা নয়; মৃত, স্থানান্তরিত ও শনাক্ত করা যায়নি এমন ব্যক্তিদের নামও বাদ দেওয়ার হিসাবের মধ্যে রয়েছে। বিরোধীরা আশঙ্কা করছে, যাচাইয়ের ত্রুটিতে প্রকৃত ভোটাররাও বাদ পড়তে পারেন।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতোই কঠোর। প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাস হতে হয়। ফলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ কিংবা অপসারণের নোটিশ জমা দিলেই তাঁকে পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়।

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া সংবাদ অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। নতুন প্রস্তাব সংসদে জমা পড়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে সংসদীয় উদ্যোগ, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ এই তিন ধারায় বিরোধীদের চাপ অব্যাহত রয়েছে। এখন প্রশ্ন, এই আন্দোলনের মুখে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে কি না এবং বিরোধীদের অভিযোগের গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি হবে কি না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ