ঋতুর পালাবদলে হেমন্ত: হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার সোনালি সৌন্দর্য

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলার প্রকৃতি যেন ছয়টি রঙে আঁকা এক অপরূপ ছবি। গ্রীষ্মের তাপদাহ, বর্ষার ঝরঝর বৃষ্টি, শরতের নীল আকাশ, হেমন্তের সোনালি ফসল, শীতের কুয়াশা আর বসন্তের রঙিন আবেশ সব মিলিয়েই বাংলার প্রকৃতি পূর্ণতা পায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা বাংলার সৌন্দর্যও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। পঞ্জিকার পাতায় আজ থেকে শুরু হেমন্তের দিন। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস নিয়ে বাংলার ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু হেমন্ত। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতির বুকে তার নীরব পদচারণা।

হেমন্ত মানেই ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশিরবিন্দু, দূরের মাঠে সোনালি ধানের দোলা, হালকা কুয়াশার আড়ালে মায়াবী গ্রাম, আর বাতাসে পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধ। এ ঋতুতে প্রকৃতি যেন ক্লান্ত পৃথিবীর বুকে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ নেই, বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিও নেই। আবার শীতের কনকনে ঠান্ডাও পুরোপুরি জেঁকে বসে না। দিনভর মৃদু রোদ আর রাতের হিমেল বাতাস মিলিয়ে হেমন্ত হয়ে ওঠে বাংলার এক অনন্য ঋতু।

একসময় গ্রামবাংলার হেমন্ত ছিল অপরূপ সৌন্দর্যের এক জীবন্ত কাব্য। দিগন্তজোড়া ধানখেত বাতাসে দুলত, কৃষকের মুখে ফুটত আশার হাসি। মাঠে মাঠে ধান কাটার ব্যস্ততা, উঠানে ধান মাড়াই, গোলাভর্তি নতুন ধান আর ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েস তৈরির আয়োজন সব মিলিয়ে হেমন্ত ছিল আনন্দ, প্রাচুর্য ও ভালোবাসার ঋতু। অগ্রহায়ণ এলেই শুরু হতো নবান্নের উৎসব। নতুন চালের ভাত, পিঠা, পায়েস আর আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলায় মুখর হয়ে উঠত গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ি।

নবান্ন শুধু নতুন ফসল ঘরে তোলার উৎসব নয়; এটি বাংলার কৃষিজীবী মানুষের দীর্ঘ পরিশ্রম, অপেক্ষা আর স্বপ্নপূরণের প্রতীক। যে কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে ফসল ফলান, হেমন্ত তাঁর কাছে নতুন আশার নাম। সোনালি ধানের প্রতিটি শিষে মিশে থাকে তাঁর ঘাম, শ্রম আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা।

কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় হেমন্ত বারবার ফিরে এসেছে শান্ত, স্নিগ্ধ ও বিষণ্ন সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় হেমন্তের বিস্তৃত মাঠ, নিস্তব্ধ প্রকৃতি ও সোনালি আভা যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বাংলাতেও ধানখেত, কুয়াশা, পাখি আর গ্রামবাংলার প্রকৃতি এক গভীর মায়া ছড়িয়ে দেয়। হেমন্ত তাই শুধু একটি ঋতু নয়, বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু আজ সেই হেমন্তের চেনা রূপ কতটা অক্ষত আছে? জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার ওঠানামা, জলাভূমি ভরাট এবং নির্বিচার বৃক্ষনিধনের কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও শীতের আগমন বিলম্বিত হচ্ছে, কোথাও অস্বাভাবিক গরম দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ঋতুর বৈশিষ্ট্যগুলোও যেন আগের মতো স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায় না। যদিও অঞ্চলভেদে এর পরিবর্তন আলাদা, তবু প্রকৃতির এই অস্বাভাবিকতা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে।

নদী-খাল-বিলের পানি কমে যাওয়া, জলাভূমির সংকোচন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাংলার ঋতুভিত্তিক সৌন্দর্যকেও প্রভাবিত করছে। একসময় যে মাঠে শাপলা-পদ্মের সমারোহ দেখা যেত, যে গ্রামে ভোরের কুয়াশা আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত, সেখানে অনেক জায়গায় প্রকৃতির সেই নিবিড় উপস্থিতি আর আগের মতো নেই। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ জীবন বদলেছে, বদলেছে মানুষের অভ্যাস ও উৎসবের ধরনও। নবান্নের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে, তবে অনেক জায়গায় তা আর আগের মতো সর্বজনীন উৎসবের আবহ তৈরি করতে পারে না।

তবু হেমন্ত এখনো আসে। কোনো এক ভোরে জানালার পাশে দাঁড়ালে শীতল বাতাস গায়ে এসে লাগে। দূরের মাঠে ধান পাকার গন্ধ ভেসে আসে, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, বাংলার প্রকৃতি এখনো তার সব সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেনি। তাকে ভালোবাসতে হবে, রক্ষা করতে হবে।

হেমন্তের সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। বৃক্ষরোপণ, জলাভূমি সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে নবান্ন, লোকজ ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরতে হবে।

হেমন্ত আমাদের শিখিয়ে দেয়, অপেক্ষারও সৌন্দর্য আছে, পরিশ্রমেরও উৎসব আছে, আর প্রকৃতির নীরবতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর সুর। বাংলার মাঠে আবার সোনালি ধান দুলুক, উঠানে উঠানে নবান্নের আনন্দ ফিরুক, শিশিরভেজা ভোরে জেগে উঠুক চিরচেনা গ্রামবাংলা এই প্রত্যাশাই হোক হেমন্তের নতুন দিনের অঙ্গীকার। কারণ হেমন্ত হারিয়ে গেলে শুধু একটি ঋতুর সৌন্দর্য হারাবে না, হারিয়ে যাবে বাঙালির শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো আবেগ, স্মৃতি ও ঐতিহ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ