ইলা মিত্র একটি নাম, একটি সংগ্রাম, একটি ইতিহাস। সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যিনি নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন, সহ্য করেছিলেন অমানুষিক নির্যাতন, তবু আদর্শ থেকে একচুলও সরে যাননি। জমিদার ও জোতদারদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিপীড়িত মানুষের আস্থার প্রতীক। শিক্ষকতা, রাজনীতি, সাহিত্যচর্চা ও কৃষক আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই রেখেছেন নিজের অসামান্য অবদান। ইতিহাসে তিনি পরিচিত ‘নাচোলের রানি’ হিসেবে। তাঁর জীবন কেবল একজন বিপ্লবী নারীর জীবনী নয়; এটি শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অধিকার আদায়ের এক অনন্য উপাখ্যান।
১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম নেওয়া ইলা মিত্রের জীবন শুরু হয়েছিল স্বচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবেশে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি তিনি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বৈষম্য ও শোষণের বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। সেই উপলব্ধি থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
তাঁর সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমির নাচোলকে ঘিরে। তৎকালীন পূর্ব বাংলার এই অঞ্চলে আদিবাসী সাঁওতাল কৃষক ও দরিদ্র বর্গাচাষিরা দীর্ঘদিন ধরে জমিদার, জোতদার এবং তাদের অধীনস্থ কর্মচারীদের শোষণ-নির্যাতনের শিকার ছিলেন। নিজেদের শ্রমে জমি আবাদ করেও তাঁরা ফসলের ন্যায্য হিস্যা পেতেন না। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন ইলা মিত্র।
ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায়। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী। পরবর্তী সময়ে রমেন মিত্রের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। রমেন মিত্রের পরিবারের জমিদারি-সম্পর্কিত সম্পত্তি ছিল তৎকালীন রাজশাহী অঞ্চলের নাচোল এলাকায়। বিয়ের সূত্রে স্বামীর সঙ্গে এই অঞ্চলে আসার পর তিনি প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হন কৃষক ও আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে।
নাচোলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তখন ছিল জঙ্গল, অনাবাদি জমি ও কৃষিনির্ভর জনপদ। সাঁওতালরা নিজেদের শ্রমে জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি আবাদযোগ্য করে তুলতেন। কঠোর পরিশ্রমে তাঁরা ফলাতেন ধানসহ বিভিন্ন ফসল। কিন্তু জমি আবাদ করার পরও জমির মালিকানা ও উৎপাদিত ফসলের ওপর তাঁদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতো না। জমিদার ও জোতদারদের নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের জীবনে নেমে আসত শোষণের বোঝা।
জমি তৈরি থেকে শুরু করে চাষাবাদ, ফসল কাটা ও ঘরে তোলা প্রতিটি পর্যায়েই কৃষকদের শ্রম থাকলেও উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ চলে যেত প্রভাবশালী ভূস্বামীদের হাতে। ঋণ, খাজনা, নানা ধরনের দাবি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দরিদ্র কৃষকেরা ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়তেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিশ্রম করেও তাঁদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হতো না।
ইলা মিত্র এই বাস্তবতা কাছ থেকে দেখেন। তিনি বুঝতে পারেন, কৃষকদের দুর্দশা কেবল দারিদ্র্যের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমির অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং ক্ষমতার অসম বণ্টন। ফলে তিনি কৃষকদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন। তাঁদের ভাষা, জীবনযাপন, অভাব-অভিযোগ ও দৈনন্দিন সংগ্রাম বোঝার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন তাঁদের আপনজন।
ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তেভাগা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, বর্গাচাষিরা উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন এবং জমির মালিক পাবেন এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ ফসলের সিংহভাগ উৎপাদন করেও যে কৃষকেরা বঞ্চিত হতেন, তাঁদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি ও ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করাই ছিল আন্দোলনের লক্ষ্য।
বাংলার কৃষকসমাজে দীর্ঘদিন ধরে জমির মালিক ও বর্গাচাষিদের মধ্যে ফসল ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ ছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্যসংকট, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই অসন্তোষকে আরও তীব্র করে তোলে। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষকসভার নেতৃত্বে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তেভাগার দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গের নাচোলেও এই আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ইলা মিত্র এবং তাঁর স্বামী রমেন মিত্র দুজনেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাচোলে এসে ইলা মিত্র সাঁওতাল কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে সক্রিয় ভূমিকা নেন। কৃষকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে তিনি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হয়ে ওঠেন।
তাঁর নেতৃত্বে কৃষকেরা নিজেদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেন। এত দিন যাঁরা ভয় ও সামাজিক বাধার কারণে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারতেন না, তাঁরাই ধীরে ধীরে সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হন। নারীদের অংশগ্রহণও আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ইলা মিত্র তাঁদের কাছে শুধু রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না; ছিলেন নির্ভরতা, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
এই কারণেই নাচোলের সাঁওতাল সমাজে তিনি ‘রানিমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ‘নাচোলের রানি’ নামটি কোনো রাজকীয় ক্ষমতার পরিচয় নয়; বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অর্জিত তাঁর বিশেষ মর্যাদার প্রতিফলন।
তেভাগা আন্দোলন কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগালেও জমিদার, জোতদার ও প্রশাসনের একাংশের কাছে তা হয়ে ওঠে উদ্বেগের কারণ। কারণ, কৃষকদের সংগঠিত প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠিত ভূমিব্যবস্থা ও প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিল।
নাচোলের আন্দোলন ক্রমে সংঘাতময় হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে গ্রামে গ্রামে তল্লাশি, অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার এবং সাঁওতালদের ওপর নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে।
প্রাণ বাঁচাতে অনেক আদিবাসী পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অনেকে গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ভেঙে পড়তে থাকে সংগঠিত প্রতিরোধ।
এই পরিস্থিতিতে রমেন মিত্র ভারতে চলে যান। ইলা মিত্রও সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রহনপুর রেলস্টেশনের কাছে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের সংগঠিত প্রতিরোধ বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
তবে আন্দোলন দমনের মধ্য দিয়ে কৃষকদের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নটি শেষ হয়ে যায়নি। তেভাগার দাবি পরবর্তী সময়েও ভূমিসংস্কার, বর্গাচাষিদের অধিকার এবং কৃষকের মর্যাদা নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ইলা মিত্রের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় তাঁর গ্রেপ্তারের পরের সময়। তাঁকে নাচোল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশি হেফাজতে তাঁর ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে তাঁর নিজের জবানবন্দি, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীর ওপর এমন নির্যাতনের ঘটনা তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। নির্যাতনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালিত হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি অবস্থায় তাঁকে শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়।
ইলা মিত্রের ওপর নির্যাতনের বিবরণ শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ইতিহাস নয়; এটি রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যে নারী কৃষকের ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাঁকেই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কঠোর দমননীতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ১৯৫৪ সালে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতে যেতে হয়। এই মুক্তি তাঁর দীর্ঘ কারাজীবনের অবসান ঘটালেও শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে তাঁকে পরবর্তী জীবন কাটাতে হয়েছে।
কিন্তু নির্যাতন তাঁর আদর্শকে পরাজিত করতে পারেনি। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সংগ্রামে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, সেই বিশ্বাস তিনি জীবনের বাকি সময়েও ধারণ করেছেন।
চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার পর ইলা মিত্র কলকাতায় অবস্থান করেন। শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পাশাপাশি তিনি আবারও পড়াশোনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়ে যান এবং ১৯৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত থাকেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানিকতলা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি চারবার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সালে বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতিকে তিনি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। বরং সাধারণ মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। নাচোলের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল।
ইলা মিত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও একাধিকবার নির্বাচিত হন। পাশাপাশি ভারতের মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ এবং পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারত-সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন।
ইলা মিত্রের পরিচয় কেবল কৃষক আন্দোলনের নেত্রী কিংবা রাজনীতিবিদ হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী ও অনুবাদক। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে রুশ সাহিত্য ও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার বিভিন্ন রচনা পৌঁছে দিতে তিনি অনুবাদের কাজ করেন।
তাঁর অনূদিত বইয়ের মধ্যে ‘জেলখানার চিঠি’, ‘হিরোশিমার মেয়ে’, ‘মনে প্রাণে’, ‘লেনিনের জীবনী’ এবং রুশ ছোটগল্পের সংকলনের নাম উল্লেখ করা হয়। সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মুক্তি, যুদ্ধের ভয়াবহতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং মানবিক মূল্যবোধের মতো বিষয়কে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন।
‘হিরোশিমার মেয়ে’ অনুবাদের জন্য তিনি ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু’ পুরস্কার লাভ করেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্যও তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বীকৃতি পান। এ ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রামী হিসেবে ভারত সরকারের কাছ থেকে তাম্রপত্র সম্মান লাভ করেন।
তাঁর জীবন ও কর্মের এই বহুমাত্রিকতা প্রমাণ করে, সংগ্রামকে তিনি কোনো একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্ন ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ইলা মিত্রের সম্পর্ক শুধু নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানান। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সহায়তা এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়।
নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন স্বাধীনতা, মর্যাদা ও মুক্তির মূল্য কতটা গভীর। পাকিস্তানি কারাগারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল।
তাঁর একটি জবানবন্দিতে উঠে এসেছে কৃতজ্ঞতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার সেই অনুভূতি। তিনি বলেছিলেন, জীবনে দুবার কবর থেকে উদ্ধার পেয়েছেন একবার বন্ধ শ্বশুরালয় থেকে, আরেকবার পাকিস্তানের কারাগার থেকে। যাঁরা তাঁকে সেই দুর্দশা থেকে উদ্ধার করেছেন, তাঁদের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন না জানিয়ে তিনি অকৃতজ্ঞ হতে চাননি। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের পাশাপাশি মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধও প্রকাশ পায়।
দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ইলা মিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফর করেন। নাচোলের মাটিতে তাঁকে ঘিরে আয়োজন করা হয় সংবর্ধনার। তাঁর ফিরে আসা ছিল শুধু একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রীকে সম্মান জানানোর ঘটনা নয়; বরং তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি, কৃষকদের আত্মত্যাগ এবং একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের উপলক্ষ।
যে অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, সেই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তাঁর কাছে ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নাচোলের মানুষ তাঁকে স্মরণ করেছে সংগ্রামের নেত্রী হিসেবে, যিনি সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা অতিক্রম করে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
নাচোলের কেন্দুয়ায় তাঁর স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত তেভাগা স্মৃতিস্তম্ভ আজও সেই সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই স্মৃতিচিহ্ন কেবল অতীতের একটি আন্দোলনের স্মারক নয়; এটি কৃষকের শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য হিস্যা এবং শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।
২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ইলা মিত্র। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয়নি। যে প্রশ্নগুলো সামনে রেখে তিনি আন্দোলনে নেমেছিলেন কৃষক কেন নিজের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য হিস্যা পাবেন না, শ্রমজীবী মানুষ কেন শোষণের শিকার হবেন, সমাজে অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা কেন থাকবে না সেসব প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।
ইলা মিত্রের জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো সহজ হয় না। কখনো ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিতে হয়, কখনো সহ্য করতে হয় নির্যাতন, কখনো হারাতে হয় পরিচিত জীবনের নিরাপত্তা। তবু আদর্শে অবিচল মানুষ নিজের বিশ্বাসের শক্তিতেই ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
নাচোলের কৃষক আন্দোলন হয়তো একসময় দমন করা হয়েছিল, কিন্তু সেই আন্দোলনের স্মৃতি মুছে যায়নি। সাঁওতাল কৃষকদের কাছে ‘রানিমা’ হয়ে ওঠা ইলা মিত্র প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্বের মর্যাদা জন্ম বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের করে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর।
তিনি জমিদারির আঙিনা থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শোষিত মানুষের পাশে। কারাগারের নির্যাতন তাঁকে থামাতে পারেনি, নির্বাসিত জীবন তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে মুছে দিতে পারেনি। বরং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি বহন করেছেন সেই সংগ্রামের স্মৃতি।
ইলা মিত্র তাই শুধু ইতিহাসের একটি নাম নন। তিনি কৃষকের অধিকার, নারীর সাহস, মানবিক মর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদের প্রতীক। যত দিন শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ ন্যায্য অধিকারের দাবি তুলবে, তত দিন নাচোলের রানির সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মকে সাহস ও প্রেরণা জোগাবে
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী