পুরোনো বন্ধুত্বের টানে নতুন ঠিকানা, উদ্বোধন হলো ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাবের

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

স্রোতের মতো বয়ে যায় জীবন। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় চারপাশের পৃথিবী, বদলে যায় মানুষের পরিচয়, অবস্থান ও জীবনযাপনের ধরন। কর্মব্যস্ত জীবনের নানা টানাপোড়েনে একসময় দূরে সরে যান প্রিয় সহপাঠীরা। কেউ ছড়িয়ে পড়েন দেশের নানা প্রান্তে, কেউবা পাড়ি জমান বিদেশে। তবু হৃদয়ের গভীরে অমলিন থেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, আড্ডা আর একসঙ্গে পথচলার স্মৃতি। সেই স্মৃতিকে ধারণ করে পুরোনো বন্ধন নতুন করে জাগিয়ে তোলা এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাব লিমিটেড’।
রাজধানীর গ্রিন রোডের ২৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ক্লাবটির নতুন কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়। সন্ধ্যা ৭ টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কার্যালয়টির উদ্বোধন করেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সমাজসেবক এবং হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার এ কে আজাদ। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর অতিথিদের স্বাগত জানানো, বক্তব্য, স্মৃতিচারণ, সংগীত ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. মাহফুজুর রহমান। সঞ্চালনা করেন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাহফুজুর রহমান চৌধুরী। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আশরাফুল হক মুকুল উপস্থিত অতিথি ও সদস্যদের স্বাগত জানান। তিনি তাঁর বক্তব্যে ক্লাব প্রতিষ্ঠার পটভূমি তুলে ধরেন এবং সংগঠনটিকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কে আজাদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। তিনি ক্লাব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করে এটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনে পরিণত করার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাব লিমিটেডকে একটি সুসংগঠিত ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রধান অতিথি এ কে আজাদসহ ক্লাবের সব সদস্যকে তিনি ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. রেজাউল করিম, শেখ সালাউদ্দিন আহমেদ ও ড. তাপস চন্দ্র পালসহ অন্যান্য জীবনসদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের পাশাপাশি উপস্থিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকের চোখেমুখে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ। পুরোনো দিনের স্মৃতি, ক্যাম্পাসের পরিচিত পথঘাট, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দুরন্ত সময় এবং জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন তাঁরা। কারও কথায় ফিরে আসে হারানো দিনের মধুর স্মৃতি, কারও স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে বন্ধুত্বের গভীরতা, আবার কারও আলোচনায় প্রাণ ফিরে পায় তারুণ্যে ভরা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সোনালি অধ্যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শ্রেণিকক্ষের পাঠ, গ্রন্থাগারের নীরবতা, ক্যাম্পাসের আড্ডা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সহপাঠীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক মানুষকে আজীবন সমৃদ্ধ করে। সময়ের ব্যবধানে মানুষের পেশা, সামাজিক অবস্থান ও জীবনযাপনের ধরন বদলে গেলেও সেই সম্পর্কের শিকড় থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে।
জীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব ও পারিবারিক বাস্তবতায় একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ কমে আসে। অথচ বহু বছর পর পুরোনো কোনো বন্ধুর মুখোমুখি হওয়া, পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা কিংবা একসঙ্গে কাটানো দিনের গল্পে ফিরে যাওয়া মুহূর্তেই ফিরিয়ে দিতে পারে তারুণ্যের সেই উচ্ছ্বাস। বয়স, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে বন্ধুত্বের বন্ধনে একত্র হওয়ার এমন সুযোগ মানুষকে নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়।
সেই বিবেচনায় ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাব লিমিটেডের যাত্রা কেবল একটি নতুন কার্যালয়ের উদ্বোধন নয়; এটি পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে প্রাণবন্ত করার পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সম্প্রীতি জোরদার করার একটি উদ্যোগ। নিয়মিত মিলনমেলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ক্লাবটি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি কার্যকর সম্মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও মেলবন্ধন তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সামাজিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পেশা ও ক্ষেত্রে তাঁদের মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার হলে তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাব লিমিটেডের সামনে রয়েছে সম্ভাবনার বিস্তৃত দিগন্ত। স্মৃতিচারণ ও আনন্দ-আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে পারলে ক্লাবটির কার্যক্রম আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগও তৈরি হবে।
কার্যালয় উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে সংগীত পরিবেশন করেন বিভিন্ন শিল্পীরা। বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বারের কালজয়ী গান পরিবেশন করে উপস্থিত অতিথি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রশংসা কুড়ান সাফাত রহমান। সংগীত ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আনন্দমুখর। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৈশভোজের মধ্য দিয়ে উদ্বোধনী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
সময় চলে যায়, বয়স বাড়ে, জীবনের সমীকরণ বদলায়; কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্বের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা মুখ, পরিচিত হাসি, আড্ডার টেবিল কিংবা একসঙ্গে কাটানো দুরন্ত দিনগুলো জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শিকড়ের কাছে। ডিইউ ওল্ড স্টুডেন্টস ক্লাব লিমিটেডের নতুন যাত্রা সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। স্মৃতির আলোয়, বন্ধুত্বের উষ্ণতায় এবং সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তিতে ক্লাবটি হয়ে উঠুক প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আনন্দ, আস্থা ও মিলনের এক আপন ঠিকানা। পুরোনো দিনের আবেগ আর নতুন দিনের সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাক এই উদ্যোগ উদ্বোধনী আয়োজনের অন্তর্নিহিত প্রত্যাশা এটাই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ