রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রান্নার জ্বালানির বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরবরাহ সংকটের কথা বলছেন বিক্রেতারা। তবে আমদানি ও বাজারে সরবরাহের তথ্যের মধ্যে অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগের কয়েক মাসের তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি থাকলেও খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার মিলছে না।
৪ অক্টোবর এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ করে বিইআরসি। এর আগে সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরের জন্য তা ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব নতুন দামে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি দাম বাড়ানোর পরও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সমাধান হয়নি।
প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি নতুন মূল্য নির্ধারণ করার পরও কেন গ্রাহককে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে? আমদানিকারক, অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে, তা নির্ধারণে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এলপিজির সরবরাহ কমতে শুরু করে। কোনো কোনো অপারেটর চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বাজারে ছাড়েননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিলারদের সিলিন্ডার সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। তবে এসব ব্যয়ের কারণে নির্ধারিত খুচরা মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বৈধতা তৈরি হয় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আমদানি বাড়লেও বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোথায় বাধা তৈরি হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রয়োজন। আমদানি করা এলপিজির পরিমাণ, অপারেটরদের মজুত, ডিপো থেকে সরবরাহ, পরিবেশকদের কাছে বিক্রির হিসাব এবং খুচরা বাজারে বিক্রির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে সংকটের প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সম্ভব। শুধু আমদানির পরিমাণ দিয়ে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; একইভাবে খুচরা বাজারে ঘাটতি দেখেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছাতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন।
বিইআরসি ইতিমধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো পক্ষ পণ্য মজুত করে রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণের সঙ্গে ডিপো থেকে সরবরাহের হিসাব মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
এলপিজির বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা। সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি ও সরবরাহ করে। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের বড় অংশ রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন। ফলে সরবরাহব্যবস্থার কোনো একটি পর্যায়ে বিঘ্ন দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি পরিবারের ব্যয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে বাজারে বাড়তি দামের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সীমিত আয়ের পরিবারগুলো। নির্ধারিত দামের তুলনায় একটি সিলিন্ডার কিনতে ৪৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি দামের চেয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩৬ শতাংশ বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। মাসে একটি সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবারকেও এই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে; একাধিক সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবারের খরচ আরও বাড়ছে।
বাজার স্থিতিশীল করতে শুধু মূল্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়, সেই মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ জন্য আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পণ্য প্রবাহ ও বিক্রয়মূল্যের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডিপোতে সরবরাহের পরিমাণ, ডিলারদের অপেক্ষার সময়, পরিবহন ব্যয় এবং খুচরা বিক্রেতাদের ক্রয়মূল্য পর্যালোচনা করা হলে কোথায় অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে, তা স্পষ্ট হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজির বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য পর্যাপ্ত মজুত ও সংরক্ষণব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জ্বালানি খাতে কৌশলগত মজুতের ঘাটতিকে সরবরাহের ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ অবকাঠামো না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা কিংবা পরিবহনপথে বিঘ্নের প্রভাব দ্রুত স্থানীয় বাজারে পড়তে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো, আমদানি করা এলপিজি কোথায় যাচ্ছে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের সুবিধা কারা পাচ্ছে। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অনুমান বা অভিযোগের ওপর নির্ভর না করে আমদানি, মজুত, সরবরাহ ও বিক্রির নথি যাচাই করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দাম আদায় কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণের পরও বাজারে গ্রাহকের স্বস্তি ফেরেনি। আমদানি বাড়ার তথ্যের বিপরীতে সরবরাহের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই বাজারে প্রকৃত সংকট আছে কি না, থাকলে তার কারণ কী এবং নির্ধারিত দামের বাইরে নেওয়া অর্থের সুবিধাভোগী কারা এসব প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক জবাব নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।