ভারতের ছাত্র রাজনীতির নতুন অগ্নিশিখা নেহা বোরা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

কখনো কখনো ইতিহাস তার নিজের প্রয়োজনে এমন কিছু তরুণ মুখকে সামনে নিয়ে আসে, যাদের কণ্ঠে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকে না থাকে একটি প্রজন্মের না-বলা কথা। যাদের চোখে শুধু স্বপ্ন থাকে না থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অদম্য সাহস। ভারতের সমকালীন ছাত্র রাজনীতিতে নেহা বোরা তেমনই এক উচ্চারিত নাম। তিনি এখন শুধু অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন AISA-এর জাতীয় সভাপতি নন; ভারতের ছাত্র-যুবসমাজের শিক্ষা, অধিকার, বেকারত্ব, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি ক্রমেই দৃশ্যমান এক প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
নেহা বোরা একজন তরুণী। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উচ্চারণে বয়সের সীমাবদ্ধতা নেই। তাঁর সামনে প্রশ্ন শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো কি না, একটি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল হলো কি না, কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন হলো কি না তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই সমাজ তার তরুণ প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
যে তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়, যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখে, যে শিক্ষার্থী নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে রাত জেগে বই পড়ে তার স্বপ্ন যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার কাছে পরাজিত হয়, তবে সেই ক্ষত কেবল একজন শিক্ষার্থীর নয়; সেই ক্ষত একটি রাষ্ট্রের বিবেকের।
এই জায়গাতেই নেহা বোরার কণ্ঠ আলাদা করে শোনা যায়।
২০২৬ সালের যন্তর মন্তরের ছাত্র-যুব আন্দোলন তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তোলে। শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়ম, বেকারত্ব এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। এমনকি দীর্ঘ ২৩ দিনের অনশনেও তিনি অংশ নেন।
অনশন শব্দটি ছোট। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে শরীরের বিরুদ্ধে শরীরেরই এক কঠিন যুদ্ধ। ক্ষুধাকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করা সহজ নয়। প্রতিটি অনাহারী রাত, প্রতিটি দুর্বল হয়ে আসা শরীর, প্রতিটি মুহূর্তে পরিবারের উৎকণ্ঠা সবকিছুকে অতিক্রম করে যখন একজন তরুণী নিজের শরীরকে প্রতিবাদের অস্ত্র করে তোলেন, তখন সেটি কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন।
নেহা বোরার সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন। তিনি মনে করেন, পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল একটি পরীক্ষাকে সুষ্ঠু করার লড়াই নয়; এটি তরুণদের স্বপ্নকে রক্ষা করার লড়াই। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায়ও তিনি তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন রক্ষার প্রশ্নটি সামনে এনেছেন।
আজকের ভারতবর্ষে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক আছে। বাম, ডান, মধ্যপন্থা সব পক্ষেরই নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান আছে। নেহা বোরা সেই বিতর্কের বাইরে নন। বরং তিনি স্পষ্টভাবেই বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির একজন সংগঠক এবং তাঁর সংগঠন AISA ভারতের বামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা আর একজন তরুণের প্রতিবাদী কণ্ঠকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
কারণ ছাত্র রাজনীতির প্রাণই হলো প্রশ্ন করা।
কেন শিক্ষা এত ব্যয়বহুল? কেন একজন মেধাবী ছাত্র অর্থের অভাবে পিছিয়ে থাকবে? কেন পরীক্ষার অনিয়মে একজন শিক্ষার্থীর বছরের পর বছর পরিশ্রম ধ্বংস হবে? কেন চাকরির অপেক্ষায় থাকা লাখ লাখ তরুণ বারবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে? কেন রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করলে প্রতিবাদকারীর কণ্ঠকে ভয় হিসেবে দেখা হবে?
এই প্রশ্নগুলোই নেহা বোরার রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে।
ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনেও তিনি সরব হয়েছেন। JPSC ও JSSC পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে AISA-এর অবস্থান তুলে ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আন্দোলনের পাশে থাকার কথা বলেছেন।
আর এখানেই নেহা বোরার রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয় তিনি শুধু দিল্লির রাজনীতির মধ্যে আটকে থাকতে চান না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ, পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে যন্তর মন্তর, শিক্ষার্থীর ক্ষোভ থেকে বৃহত্তর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন সবকিছুকে তিনি একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রতিবাদেও তাঁর অংশগ্রহণ এবং আটক হওয়ার ঘটনা তাঁকে আবারও জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে।
একজন ছাত্রনেতার জন্য পুলিশের হাতে আটক হওয়া কোনো গৌরবের বিষয় নয়। কিন্তু যখন প্রতিবাদী রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতি আসে, তখন প্রশ্নটি আরও গভীর হয় রাষ্ট্র কি তার তরুণ নাগরিকের প্রশ্ন শুনতে প্রস্তুত?
নেহা বোরার রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হয়তো এখানেই তিনি ভয়কে রাজনীতির শেষ কথা হতে দিতে চান না। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজনীয়তা। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের পর ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কথা বলার ভয় কমেছে।
ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন কখনো কেবল ক্যাম্পাসের দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন তরুণেরা বহুবার ইতিহাসের গতিপথে নিজেদের ছাপ রেখেছে। কারণ তরুণ বয়সের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো প্রশ্ন করার সাহস; আর সেই সাহস যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়, তখন তার অভিঘাত অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
নেহা বোরা সেই ঐতিহ্যের নতুন প্রজন্মের একজন মুখ।
তাঁর কণ্ঠে হয়তো অনেকের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকবে। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তর্ক থাকবে। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক হবে। কিন্তু বিতর্কই তো গণতন্ত্রের প্রাণ। প্রশ্নহীন ক্যাম্পাস, ভীত শিক্ষার্থী, নীরব শিক্ষক এবং নির্বাক সমাজ কোনো জীবন্ত গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো প্রশ্নের জন্মস্থান। সেখানে ইতিহাসকে প্রশ্ন করা হবে, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা হবে, অর্থনীতিকে প্রশ্ন করা হবে, সমাজের বৈষম্যকে প্রশ্ন করা হবে। আর সেই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তৈরি হবে আগামী দিনের মানুষ।
নেহা বোরা সেই প্রশ্ন করার অধিকারের কথা বলছেন।
তাই তাঁকে শুধু একজন ছাত্রনেত্রী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁকে দেখতে হবে একটি সময়ের প্রতীক হিসেবে যে সময়ে ভারতের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মর্যাদা, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগ যদি সংগঠিত ভাষা পায়, যদি তা যুক্তির সঙ্গে রাজপথে আসে, যদি তা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে পরিণত হয়, তাহলে সেই কণ্ঠকে উপেক্ষা করা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই সহজ নয়।
নেহা বোরা হয়তো ইতিহাসের শেষ অধ্যায় নন। বরং তিনি একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হতে পারেন।
আজকের ছাত্র রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি হয়ে যায়, তাহলে তার কোনো মহত্ত্ব নেই। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি যদি নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করে, শিক্ষা ও মানবিক মর্যাদাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াই করে তাহলে সেই রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই নেহা বোরার মতো তরুণ নেতৃত্বকে নিয়ে আলোচনা জরুরি।
কারণ আগুন শুধু পুড়িয়ে দেয় না। আগুন পথও দেখায়।
অন্ধকার সময়ের বুক চিরে যে তরুণ কণ্ঠ উচ্চারণ করে ‘ভয় পেও না, প্রশ্ন করো’ সেই কণ্ঠই একদিন হাজারো কণ্ঠের জন্ম দিতে পারে।
ভারতের ছাত্র রাজনীতির আকাশে নেহা বোরা আজ তেমনই এক অগ্নিশিখা যার আলো কত দূর ছড়াবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু এটুকু ইতিমধ্যেই স্পষ্ট: তিনি নীরবতার রাজনীতিকে মেনে নিতে রাজি নন। তিনি প্রশ্নের রাজনীতি, প্রতিবাদের রাজনীতি এবং তরুণদের স্বপ্নের রাজনীতিকে সামনে আনতে চাইছেন।
আর ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের আগে কোথাও না কোথাও এমনই একটি ছোট অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠে।
হয়তো নেহা বোরা সেই অগ্নিশিখারই নতুন নাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ