একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তার চোখে কোনো বৈষম্য থাকে না। সে জানে না ছেলে কী, মেয়ে কী। সে জানে না সমাজ তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। তার কাছে পৃথিবী মানে আলো, ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন। কিন্তু জন্মের পরই অনেক কন্যাশিশুর সেই স্বপ্নের পথে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হতে শুরু করে। কোথাও তাকে বলা হয়, ‘তুমি মেয়ে’ কোথাও তার পড়াশোনার চেয়ে বিয়েকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়; কোথাও তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ একটি কন্যাশিশুও স্বপ্ন দেখতে পারে, নিজের পরিচয় তৈরি করতে পারে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে।
প্রতিবছর ১১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। মেয়েদের দিন হিসেবেও পরিচিত এই দিবসের মূল লক্ষ্য কন্যাশিশুদের অধিকার, সম্ভাবনা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করা। শিক্ষার অধিকার, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, ন্যায়বিচার, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কন্যাশিশুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে দিনটি।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ আন্দোলনের গল্প। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ‘কারণ আমি একজন মেয়ে’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কন্যাশিশুদের অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। মেয়েদের প্রতি বৈষম্য দূর করা এবং তাদের অধিকার ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই ছিল এ আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। পরে কানাডার উদ্যোগে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও গুরুত্ব পায়। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।
একটি দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে যে ইতিহাস রয়েছে, সেটি আসলে একটি গভীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর কোটি কোটি কন্যাশিশু এখনো এমন বাস্তবতার মধ্যে বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের জন্মই কখনো কখনো পরিবারের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও ছেলে সন্তানের জন্য উৎসব হয়, আর মেয়ের জন্মে নেমে আসে নীরবতা। কোথাও মেয়েটিকে স্কুলে পাঠানোর বদলে ঘরের কাজে যুক্ত করা হয়। কোথাও তার বই-খাতা কেনার টাকা নেই, অথচ তার বিয়ের জন্য পরিবারকে টাকা জমাতে হয়। এই বৈষম্য কেবল একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় না, তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করে।
একটি কন্যাশিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে পড়তে শেখানো নয়; তার সামনে একটি পৃথিবীর দরজা খুলে দেওয়া।
শিক্ষা তাকে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে শেখায়, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয় এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করে। যে মেয়ে আজ স্কুলে যাচ্ছে, সে আগামী দিনে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন মানুষ হতে পারে। তার সম্ভাবনার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। সীমা তৈরি করে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
কন্যাশিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ শৈশব। অথচ অনেক মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, নির্যাতন, পাচার কিংবা বাল্যবিবাহ এসব তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে বড় বাধা। একটি শিশুর কাঁধে যখন সংসারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার শৈশব হারিয়ে যায়। যখন তার হাতে বইয়ের বদলে তুলে দেওয়া হয় সংসারের বোঝা, তখন থেমে যায় তার অনেক সম্ভাবনা।
বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুর জীবনের ওপর সবচেয়ে নির্মম প্রভাবগুলোর একটি। যে বয়সে একটি মেয়ের স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই অনেক মেয়েকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। বিয়ের পর তার শিক্ষা থেমে যায়, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। একটি শিশুকে তার শৈশব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশেও কন্যাশিশুর অগ্রযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে, কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু অগ্রগতির পাশাপাশি এখনো রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, পুষ্টির ঘাটতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে বৈষম্য অনেক মেয়ের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একটি মেয়েকে নিরাপদ রাখতে শুধু তার পরিবারকে সচেতন করলেই হবে না; পুরো সমাজকে বদলাতে হবে। তাকে ‘মেয়ে’ হিসেবে নয়, প্রথমে একজন মানুষ ও একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার স্বপ্নকে ছোট করে দেখা যাবে না। তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে সমাজকে ভাবতে হবে কেন একজন শিশুকে নিজের নিরাপত্তার জন্য এতগুলো বাধা অতিক্রম করতে হবে?
কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব শুধু পরিবার কিংবা সরকারের নয়। বিদ্যালয়, সমাজ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রত্যেক মানুষেরই এখানে ভূমিকা রয়েছে। একটি মেয়েকে যখন তার পরিবার বলে, ‘তুমি পারবে’, তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। একজন শিক্ষক যখন তাকে উৎসাহ দেন, তখন তার সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়। সমাজ যখন তাকে নিরাপদ পরিবেশ দেয়, তখন সে ভয় নয়, স্বপ্ন নিয়ে বড় হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কন্যাশিশুর জন্য বিনিয়োগ আসলে একটি সমাজের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। একটি শিক্ষিত, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী মেয়ে শুধু নিজের জীবনই বদলায় না; ভবিষ্যতে সে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং বৃহত্তর সমাজকে বদলে দিতে পারে। একটি মেয়ের শিক্ষা মানে একটি পরিবারের জ্ঞান বাড়া, একটি মেয়ের নিরাপত্তা মানে একটি সমাজের মানবিক হওয়া এবং একটি মেয়ের স্বপ্ন পূরণ মানে একটি দেশের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হওয়া।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। এটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রশ্ন আমরা কন্যাশিশুদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই? এমন একটি পৃথিবী, যেখানে জন্মের পর থেকেই তার পরিচয় হবে ‘মেয়ে’ বলে সীমাবদ্ধ, নাকি এমন একটি পৃথিবী, যেখানে সে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করতে পারবে?
প্রতিটি কন্যাশিশুর চোখে একটি পৃথিবী থাকে। সেখানে থাকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন, আকাশে উড়ার স্বপ্ন, নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। একটি শিশুর স্বপ্নের চেয়ে কোনো সামাজিক কুসংস্কার বড় হতে পারে না, কোনো বৈষম্য বড় হতে পারে না, কোনো অযৌক্তিক প্রথাও বড় হতে পারে না।
আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের মা, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক।
কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তাকে আজ একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ শৈশব দিতে হবে। তাকে পড়তে দিতে হবে, খেলতে দিতে হবে, প্রশ্ন করতে দিতে হবে, ভুল করতে দিতে হবে এবং নিজের স্বপ্ন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে।
একদিন হয়তো এমন একটি পৃথিবী তৈরি হবে, যেখানে কোনো মেয়ের জন্মে কেউ আফসোস করবে না, কোনো কন্যাশিশুকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না, কোনো শিশুর শৈশব বাল্যবিবাহে হারিয়ে যাবে না। যেখানে একটি মেয়ে রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করতে পারবে।
সেই পৃথিবী তৈরি করার শুরুটা আজ থেকেই হতে পারে। একটি কন্যাশিশুর হাত ধরে, তার কথা শুনে, তার স্বপ্নকে বিশ্বাস করে। কারণ প্রতিটি মেয়েই সম্ভাবনার এক একটি নতুন গল্প। তাকে সুযোগ দিলে সে শুধু নিজের গল্প লিখবে না সে বদলে দিতে পারে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি দেশও। কন্যাশিশুর স্বপ্ন যেন কখনো তার লিঙ্গের কাছে পরাজিত না হয়, এই হোক আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
shafiqualalam@gmail.com